ক্রসফায়ার ক্রস-চেক/ আশ্বাস-টাকা কিছুতেই রক্ষা পেল না বেলালের প্রাণ (ভিডিও জবানবন্দি)

0

চট্টগ্রামের খুলশীতে দিনে আত্মসমর্পণ করার পর রাতে অস্ত্র উদ্ধারের নামে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত বেলাল (৪৩) পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেই থানায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পুলিশের আশ্বাসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ঢাকা থেকে থানায় এসে স্বাভাবিক জীবন পাওয়া দূরের, তার প্রাণটাই গেল। এমনকি বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) খুলশী থানা পুলিশকে ৫০ হাজার টাকাও দেওয়া হয়েছিল পরিবারের পক্ষ থেকে, তাকে যেন আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

ক্রসফায়ারের সমূহ ভয় যেন মিথ্যা হয়—এমন শঙ্কায় সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খুলশী থানায় পরিবারের সদস্যরা অবস্থান করছিল। যে পুলিশের আশ্বাসে থানায় আত্মসমর্পণ করেছিলেন বেলাল, সেই পুলিশের আশ্বাসেই একপর্যায়ে থানা ত্যাগ করে বেলালের পরিবার। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা থানা থেকে সরতেই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাকে নিয়ে কথিত অস্ত্র উদ্ধারে বের হয় পুলিশ। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পুলিশের কথায় আত্মসমর্পণ ও থানা ত্যাগ করা মানুষগুলো পরে সকালে টিভির সংবাদে দেখতে পান পরিবারের প্রধান কর্তাটি কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

পরিবারের অভিযোগ এমন হলেও পুলিশের দাবি বরাবরের মতই একই। তারা বলছে, আত্মসমর্পণ করার পর ১৩ মামলার আসামি বেলাল তার অপরাধজগতের নানা তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র মজুদের তথ্য দেওয়ায় তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে সহযোগীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। তবে এটাকে ভয়ংকর মানবধিকার লঙ্ঘনের শামিল বলছেন মানবধিকার সংস্থাগুলো। এমনকি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও এটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করে নিন্দা জানিয়েছেন।

নিহত বেলাল কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার মোহনপুর এলাকার আব্দুল কাদেরের ছেলে। তিনি চট্টগ্রাম নগরের আমবাগান রেলওয়ে লোকোশেড কলোনিতে বসবাস করতেন। তার বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে বলে জানান খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রণব চৌধুরী।

নিহত বেলাল স্থানীয় ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণের অনুসারী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও। তবে বছর দেড়েক আগে থেকে তিনি মামলার ভয়ে ঢাকায় গিয়ে তাবলিগ জামায়াতে মনোনিবেশ করেন। নিয়মিত নামাজ কালাম পড়া শুরু করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। এ কয়েক বছর তার বিরুদ্ধে কোনও মামলাও ছিল না বলে জানান কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণ ও বেলালের পরিবারের সদস্যরা।

দিনের বেলায় আত্মসমর্পণ করে রাতের বেলা কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত বেলালের বিষয়ে খুলশী থানার ওসি প্রণব চৌধুরী বলেন, ‘বেলাল দিনে আত্মসমর্পণ করলে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি জালালাবাদ পাহাড়ের গোপন আস্তানায় অস্ত্র মজুদ রাখার কথা জানান। রাত দেড়টার দিকে তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গেলে সেখানে তার সহযোগীরা আমাদের আক্রমণ করে। এ সময় প্রতিরোধ করলে বেলাল ও এসআই মাহবুুব অপু সহ তিন পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বেলালকে মৃত ঘোষণা করেন। আর মাহবুব অপু ও দুই পুলিশ কনস্টেবলকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেন। এ সময় একটি এলজি, তিনটি রাম দা ও চার রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয় ঘটনাস্থল থেকে।’

তবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির নায়েক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ বেলালকে বৃহস্পতিবার ভোর ছয়টার দিকে হাসপাতালে আনেন খুলশী থানা পুলিশের একটি টিম। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক বেলালকে তখনই মৃত ঘোষণা করেন।’ শরীরের কোন্ কোন্ জায়গায় গুলি লেগেছে তা বলতে রাজি হননি তিনি।

যদিও বুধবার ওসি প্রণব চৌধুরী বলেছিলেন, ‘বেলাল পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি, খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। ১১টি মামলায় জামিনে ছিল। দুটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল বেলালের বিরুদ্ধে। যে দুটি মামলায় বেলালের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে ওই মামলাগুলোতে বেলালকে গ্রেফতার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হবে। বেলাল স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। আমরা তাকে আইন অনুযায়ী সহযোগিতা করবো।’

নিহতের পরিবারের আহাজারি: 'এই বিচার কাকে দিব? আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম'
নিহতের পরিবারের আহাজারি: ‘এই বিচার কাকে দিব? আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম’

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে বাবার মরদেহ নিতে আসেন নিহত বেলালের স্বজনরা। এসময় সেখানে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সঙ্গে কথা হয় নিহতের ছেলে টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র মোহাম্মদ সজীবের। সে চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলে, ‘আমার বাবা পরিবর্তন হতে চেয়েছিল। পুলিশের কথামত তাদের হতে ধরাও দিল। তাদেরকে টাকাও দিল কিন্তু আমার বাবাকে তারা ভাল হতে দেয়নি। আমার বাবাকে মেরে ফেলল তারা। আমার বাবা গতকাল সকালে পুলিশের ডিসি নর্থ বিজয় বসাকের কথামত খুলশী থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। থানার পুলিশ আমার বাবাকে আজকে আদালতে আনার কথা বলে থানায় রেখেছিল। আমার বাবার বিরুদ্ধে মামলা ছিল সেটা ঠিক। সবকটি মামলা ৮-১০ বছর আগের। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতো বলে বিএনপির আমলে আমার বাবাকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। তিনি বর্তমান পাহাড়তলীর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণ আংকেলের সাথে রাজনীতি করতেন।’

বেলালপুত্র সজীব আরো বলে, ‘আমার বাবা গত একবছর ঢাকায় ছিল। সেখানে তিনি পালিয়ে গিয়েছিল কারণ খুলশী থানার আগের ওসি (শেখ নাসির উদ্দিন) আমার বাবার কাছ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা নিয়েছিল এই মামলাগুলোর জন্য। যখন আরো টাকা চায় তখন না দিতে পারলে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিতে থাকে আমার বাবাকে। তখন তিনি ঢাকায় চলে যায়। তিনি সেখানে তবলিগ করতেন। মসজিদে থাকতেন। ভাল হয়ে গিয়েছিল তিনি। ঢাকায় থাকার জন্য তিনি আমার দাদা-দাদীর মৃত্যুর সময়ও আসতে পারেনি। আমাদের পরিবারে নতুন সদস্যও চলে আসছে। এর মধ্যে আমার ছোট্ট বোনের তার ১০ মাস চলতেছে।’

নিহত বেলালের ছেলে আরো বলে, ‘তাই তিনি চট্টগ্রামে আমার এক ভাইয়ের মাধ্যমে ডিসি নর্থ বিজয় বসাকের সাথে যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণ করে থানায়। ডিসি নর্থের কথামত আমরা ২০ হাজার টাকা খরচ করে আমার বাবার বিরুদ্ধে দুইটি গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি করানো হয়, যাতে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আমার বাবাকে আদালতে হাজির করতে পারে।’

সে আরও বলে, ‘গতকাল আমার বাবা আত্মসমর্পণের পর পুলিশ টাকা চাইলে আমরা টাকাও দিই যেন সব ঠিকঠাক থাকে। ওসিসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে আমাদের মোট ৭০ হাজার টাকা দিতে হয়। আমরা রাতে থানায় থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ ‘কোন সমস্যা হবে না’ বলে আমাদেরকে বাড়িতে চলে যেতে বলে। আমার মা যখন সকাল ৬ টায় নাস্তা নিয়ে থানায় যায়, তখন বাবাকে না দেখে পুলিশকে জিজ্ঞেস করলে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানায় তারা অভিযানে গিয়েছে। পরে ৯টা-১০টার দিকে আমরা খবরে দেখি আমার বাবা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। খবর পেয়ে আমারা এখানে (মর্গে) আসি। এখন দুপুর ১২টা। এখনো আমার বাবাকে দেখিনি। কয়টা গুলি লাগছে তাও জানি না।’

সজীব বলে, ‘আমরা এখন একা হয়ে গেছি। আমার মা, আমার ছোট ভাই যে এখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে আর ছোট বোনের বয়স ১০ মাস আমার বাবা তাকে দেখেওনি। এই দেশে তো আইনের শাসন নেই। দেশের আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রতি আমার আর কোনও বিশ্বাস নেই।’

নিহত বেলালের স্ত্রী রহিমা বেগম জানান, তাদের বড় ছেলে মোহাম্মদ সজীব টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে পড়ে। মেজ ছেলে আতিক হাসান বিশাল প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে আর ছোট মেয়ে জান্নাতুল
অর্পির বয়স মাত্র ১০ মাস।

এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘আমার আর কোনও কিছু বলার নেই। যে ভালো হতে চেয়েও পুলিশের কারণে ভালো হতে পারেনি। এই বিচার কাকে দিব? আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। আমার এই কথাগুলো কি প্রধানমন্ত্রীকে কেউ পৌঁছাতে পারবেন?’

তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল (বুধবার) সকালে ডিসি-ওসির সঙ্গে কথা বলেই আমার স্বামীকে থানায় নিয়ে গেছি। এ সময় তার কাছে একটি মিসওয়াক ও তসবিহ ছিল। এগুলো পুলিশ আমাদের ফেরত দিয়ে তাকে থানার হাজতে রেখেছিল। রাতে পুলিশ হেফাজতে থাকা জীবিত মানুষটি সকালে উঠে শুনলাম তাকে ক্রসফায়ার দিয়ে মেরে ফেলেছে।’

তবে এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিএমপির উপ কমিশনার (উত্তর) বিজয় কুমার বসাক বলেন, ‘অনেকে অনেক কথা বলবে সেটা সত্য হবে তা না। কেউ আমার কাছে এসে আমার কথায় আত্মসমর্পণ করেনি।’

বেলালের পরিবারের এক আত্মীয় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করেই ঢাকা থেকে এসে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন নিহতের ছেলে সজীব—এমন প্রশ্নের উত্তরে বিজয় বসাক বলেন, ‘অহ হ্যাঁ। একজন সাংবাদিক এসেছিল আমার কাছে। আমি বলেছি আইন সবার জন্য সমান। সে যদি আইনের পথে এসে আইন মানতে চায় মানুক। আর কোনও কথা হয়নি বা তাকে আত্মসমর্পণও করতে বলা হয়নি। তার দায়দায়িত্বও আমি নেইনি।’

তবে সকালে আত্মসমর্পণ করার পর রাতে কেন বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটলো? কেননা এর আগেই খুলশী থানার ওসি বলেছিলেন, তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হবে—এ প্রশ্নের উত্তরে পুলিশের উত্তর জোনের প্রধান বিজয় বসাক বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে ডাকাতি, ডাকাতির প্রস্তুতি, মাদক, ছিনতাইসহ মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। সে যখন আত্মসমর্পণ করেছিল তখন আমরা তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন সে তার দীর্ঘদিনের অপরাধ জগত সম্পর্কে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে থাকে। পরে রাতের দিকে তার তথ্যে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে সহযোগীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সে মারা যায়।’

খুলশী থানা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরণ বলেন, ‘বেলাল দুঃসময়ের আওয়ামী লীগের কর্মী। হতে পারে সে খারাপ বা তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা রয়েছে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে বলেছেন, কোনও অপরাধী যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে স্বাভাবিক পথে আসতে চায় তাহলে তাকে সেই সুযোগ দিতে। বেলালও পুলিশকে বিশ্বাস করে আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নিজেই থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল। কিন্তু তার সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারেনি পুলিশ। তাকে কথিত এনকাউন্টার দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যত মামলা আছে তাকে প্রয়োজনে বিচারের মুখোমুখি করা হতো। কিন্তু এমন কাজটা খুবই নিন্দনীয় ও দুঃখজনক।’

কাউন্সিলর হিরণ আরও বলেন, ‘বেলাল দলের কোনও পদে না থাকলেও সব সময় মিটিং মিছিলে অংশ নিতো। তার বিরুদ্ধে যতো মামলা, তার বেশিরভাগই জোট সরকারের আমলে করা মামলা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ লোকজন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এসব মামলা করেছিল। গত কয়েক বছরে সে এলাকা ছেড়েছিল। সে স্বাভাবিক জীবনযাপনই করছিল। কিন্তু তাকে কেন যেন স্বাভাবিক পথে আসার সুযোগ না দিয়ে এনকাউন্টার দিল, তা আমার বোধগম্য না।’

এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘দিনে আত্মসমর্পণকারীকে আইনের মাধ্যমে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও যখন ক্রসফায়ার দেওয়ার অভিযোগ উঠে, তা অবশ্যই উদ্বেগজনক। যদিওবা পুলিশ এ ঘটনায় প্রতিবারের মতই তাদের সেই কথিত বন্দুকযুদ্ধের গল্প সাজাবে আর ভিকটিমের পরিবারের দাবিকে অস্বীকার করবে। কিন্তু যে অভিযোগ উঠেছে তার সত্যিই ভয়াবহ ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি দেশের বাইরে থাকায় বেশি কথা বলতে পারছি না। তবে পুলিশ যেই কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সেরকম হলে তারা দুই রকমের অপরাধ করেছে। এক. বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড করেছে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে। দুই. একজন মানুষকে আইনের মাধ্যমে স্বাভাবিক পথে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই বিশ্বাসভঙ্গ
করেও প্রতারণা করেছে। আইনশৃঙখলা বাহিনীর বিরুদ্ধে এমনিতে মানুষের আস্থা সংকট রয়েছে। তার ওপর এই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিনে আত্মসমর্পণ করিয়ে রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে একজনকে মেরে ফেলার ঘটনায় আস্থার সংকট আরও বাড়বে।’

এ প্রসঙ্গে সিএমপি কমিশনার মাহবুবর রহমান বলেন, ‘অফিসিয়ালি বা তার পরিবার থেকে কেউ অভিযোগ করেনি। আপনার মাধ্যমে তা শুনলাম। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তবে আত্মসমর্পণ করলেই অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়া যাবে না তা সত্য না। কেন তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে যেতে হয়েছে, বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে তা এসি-ডিসি-ওসি তারাই ভালো ব্যাখা দিতে পারবে।’

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল এমপির মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তার এপিএস জানিয়েছেন, মন্ত্রী একটি জরুরি সভায় ব্যস্ত আছেন।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কমপক্ষে ২০৪ জন নিহত হয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই বাহিনীগুলো আত্মরক্ষায় গুলি চালানোর একই কথা বলে আসছে। কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করলেও পুলিশ তাদের কোনও মামলা করতে দেয়া হয়নি। বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোর কোনও তদন্ত হয় কিনা সেই প্রশ্ন করে আসছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

এছাড়াও সম্প্রতি একটি আবেদনের শুনানি শেষে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে উচ্চ আদালত বলেছেন, ‘বিচারবহির্ভূত যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়, সেগুলো আমরা পছন্দ করি না, সমর্থন করি না। আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আত্মরক্ষায় গুলি করার যে সুযোগ দেওয়া আছে, তার যেন অপপ্রয়োগ না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এই আত্মরক্ষার বিষয় সামনে রেখে যাতে কেউ অযাচিত বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড না ঘটানো না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন