আক্রান্ত
২৪৬০৪
সুস্থ
২০৭৪৯
মৃত্যু
৩১৮

‘কুত্তার খানা’য় বছরে ৩০০ কোটি টাকার ব্যবসা, পথ দেখাচ্ছে চট্টগ্রাম

নাড়িভুঁড়ির টন ৫-৬ লাখ টাকা, লিঙ্গ ৬-৭ লাখ টাকা

1

‘এগিন অইলদে কুত্তার খানা। তুই পঅল না?’ (এগুলো হল কুকুরের খাবার, তুমি কি পাগল নাকি?)— চট্টগ্রামের ইলিয়াছকে অনেকটা ক্রুদ্ধ স্বরে এভাবেই বলেছিলেন তার এক চাচা। ২০ বছর আগের কথা। গরু-ছাগলের নাড়িভুঁড়ি আর লিঙ্গ বিদেশে রপ্তানি করতে চান— এমন ইচ্ছের কথা শুনে চাচার বকা খেলেও দমে যাননি তিনি। এমন ফেলনা জিনিসও যে রপ্তানি করা যায়, সেটা বাংলাদেশে তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন। আর আজ ওই ফেলনা জিনিসই বিদেশে রপ্তানি করে দেশের ৪০ জন ব্যবসায়ী ব্ছরে আয় করছেন ৩০০ কোটি টাকা। উচ্ছিষ্ট হিসেবে নদী-খাল ও নালা-ডোবায় ফেলে দেওয়া নাড়িভুঁড়ি (ইংরেজিতে ‘ওমাসম’) ও লিঙ্গের দামই এখন তোলায় তোলায়। বিদেশে এই দুই পণ্যের চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। আগে ক্রেতাদের কাছে ছুটতে হতো, আর এখন বিদেশের ক্রেতারাই ছুটে আসছেন বাংলাদেশে।

চট্টগ্রামের মোহাম্মদ ইলিয়াছের হাত ধরে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথম রপ্তানি হয় গবাদিপশুর নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ। ১৭ বছর পেরিয়ে এখনও এই দুই পণ্যের রপ্তানিকারকদের বেশিরভাগই চট্টগ্রাম অঞ্চলেরই। এর মধ্যে রয়েছে ম্যাক্স ট্রেড, কারমেন ইন্টারন্যাশনাল, স্কাই নেট সি ফুডস কোম্পানি, কনফারেন্স ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ক্যামরিজ সি ফুড ইন্টারন্যাশনাল, আরএসএম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, স্ট্যান্ডার্ড অ্যালাইড ফুড ইন্টারন্যাশনাল, জিআর এক্সপো ইন্টারন্যাশনাল, ভিভিড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, সানগ্রেন ট্রেডিং, আরএসবি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ওশান সি ফুডস ইন্টারন্যাশনাল, ফোরজি প্রাইভেট লিমিটেড, রিফাত ট্রেডিং এজেন্সি, জোরাক ট্রেড সোর্স লিমিটেডসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।

২ কনটেইনার থেকে ১২০

চট্টগ্রামভিত্তিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কারমেন ইন্টারন্যাশনালের মালিক আরাফাত হোসেন। গরু-ছাগলের নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গের সফল এই রপ্তানিকারক জানালেন, শুরুতে প্রতি মাসে রপ্তানি হতো দুই থেকে তিনটি কন্টেইনার (১টি কন্টেইনার = ২৮ টন, ১ টন = ১ হাজার কেজি)। বছরে তখন এই রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়াতো ২৪ থেকে ৩৬ কন্টেইনার পর্যন্ত।

চট্টগ্রামের মোহাম্মদ ইলিয়াছের হাত ধরে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথম রপ্তানি হয় গবাদিপশুর নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ।
চট্টগ্রামের মোহাম্মদ ইলিয়াছের হাত ধরে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথম রপ্তানি হয় গবাদিপশুর নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ।

তবে দিন দিন বাড়তে থাকে রপ্তানির পরিমাণ। আরাফাত বলেন, ২০১৭-১৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১২০ কন্টেইনার বা সাড়ে তিন হাজার টন নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ রপ্তানি করা হয়— যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ পরিমাণ কিছুটা কমে যায়। ওই সময় রপ্তানি হয়েছে ৯৬ কন্টেইনার নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ। অন্যদিকে ২০১৯-২০ সালে করোনা মহামারিতে লম্বা সাধারণ সরকারি ছুটির ফাঁদে পড়ে স্বাভাবিকভাবেই কমে যায় রপ্তানির পরিমাণ। তবে চাহিদা কিন্তু কমছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে।

পথ দেখিয়েছেন চট্টগ্রামের ইলিয়াছ

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশের পূর্ব শহীদনগরের মোহাম্মদ ইলিয়াছের হাত ধরে ২০০৩ সালে দেশ থেকে প্রথম রপ্তানি হয় গবাদিপশুর নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ। তখন বলতে গেলে কেউই সেভাবে জানতেন না, এমন ফেলনা জিনিসও বিদেশে রপ্তানি হয়!

শুরুর গল্পটা তার নাটকীয়। সেই ২০০০ সালের কথা। ইলিয়াছ একদিন দেখেন, কসাইখানায় গরু জবাইয়ের পর এক পাহাড়িসহ দুই বাঙালি নাড়িভুঁড়িগুলো বস্তায় ভরে নিয়ে যাচ্ছেন। কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, কেন নিচ্ছেন— এমন প্রশ্নে তারা থাকেন নিরুত্তর। কৌতূহল বাড়তে থাকে ইলিয়াছের। সেই কৌতূহল থেকে গোপনে তাদের পিছু নেন তিনি। যেতে যেতে একপর্যায়ে তিনি লোকগুলোকে অনুসরণ করে কালুরঘাটে চলে যান। সেখানে অপেক্ষা করে দেখেন, টিনের একটি ঘরে লবণ দিয়ে নাড়িভুঁড়িগুলো মজুত করা হচ্ছে। খোঁজখবর নিয়ে পরে তিনি জানতে পারেন, টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে নাড়িভুঁড়িগুলো চোরাই পথে ঢোকে চীনে। সেই দেশে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা।

ইলিয়াছের এবার শুরু হয় অন্য অভিযান— নিজের চোখে দেখতে হবে এসব নাড়িভুঁড়ি এরপর কোথায় যায়, কিভাবে যায়? কালুরঘাটের টিনের ঘরটাকে চোখে চোখে রাখতে থাকেন তিনি। একদিন সেখানে এলো একটি ট্রাক। সেই ট্রাকে তোলা হয় টন টন নাড়িভুঁড়ির বস্তা। ব্যস, ইলিয়াছের গাড়ি সেই ট্রাকের পেছনে পেছনে চলতে থাকে। এভাবে একসময় পৌঁছে যান টেকনাফ স্থলবন্দরে। তিনি বুঝতে পারেন, টেকনাফ থেকে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে নাড়িভুঁড়িগুলো চোরাই পথে চীনে পাচার হয়ে যাবে।

২০১৭-১৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১২০ কন্টেইনার বা সাড়ে তিন হাজার টন নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ রপ্তানি করা হয়— যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
২০১৭-১৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১২০ কন্টেইনার বা সাড়ে তিন হাজার টন নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ রপ্তানি করা হয়— যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

ইলিয়াছ এভাবে বছরকয়েক লেগে থাকেন এই ব্যবসার নাড়ি-নক্ষত্রের খোঁজে। পরিচিত অনেকেই তার এই ‘পাগলামি’র খোঁজও জানতেন। ২০০৩ সালের একদিন হঠাৎ ঢাকার অভিজাত হোটেলের শেফ হিসেবে কাজ করা দুই বন্ধুর ফোন পান। তারা জানান, ভারতের মেঘালয় থেকে গরুর নাড়িভুঁড়ি কিনতে বাংলাদেশে এসেছেন ডি কংলা নামের এক নারী। ইলিয়াছ সেটা সরবরাহ করতে পারবেন কিনা জানতে চান তারা। ঢাকার বারিধারায় গিয়ে ইলিয়াছ ওই নারীর সঙ্গে দেখা করেন। মেঘালয়ের সেই ডি কংলাই প্রথম শিখিয়ে দেন, গরুর নাড়িভুঁড়ি থেকে কিভাবে গোবর বের করে আনতে হয়, কিভাবে সেটা কাটতে হয়, কিভাবে ধুয়ে লবণ মাখাতে হয়। এমনকি কোল্ড স্টোরেজে রাখা থেকে শুরু করে সেই নাড়িভুঁড়ি গাড়িতে তোলার বিশেষ কৌশলও শিখিয়ে দেন ওই নারী। চট্টগ্রামের ইলিয়াছ এই ডি কংলার কাছে সেই প্রথম বিক্রি করেন এক টন নাড়িভুঁড়ি— যা থেকে পান এক হাজার ডলার। ১৭ বছর আগের কড়কড়ে এক হাজার ডলার‍!

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি ইলিয়াছকে। ওই বছরেই তাহের সিদ্দিকী ও মোহাম্মদ নাছির নামে দুই পাকিস্তানি ব্যবসায়ী গরুর নাড়িভুঁড়ি কেনার জন্য চলে আসেন সরাসরি চট্টগ্রামে। প্রতি টন নাড়িভুঁড়ির জন্য ১ হাজার ২২৫ ডলার দিতে সম্মত হন তারা। পরের বছরেই ৭ কনটেইনার বা প্রায় ২০০ টন নাড়িভুঁড়ি রপ্তানি করেন হংকংয়ে। এভাবে রপ্তানির পরিমাণ যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি দেশের সংখ্যাও বাড়তে থাকে ইলিয়াছের।

এখন থেকে ১৫ ব্ছর আগে ইলিয়াছ প্রতিষ্ঠা করেন কেমরিজ সি ফুডস ইন্টারন্যাশনাল। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় আরও এক কোম্পানি— জিমকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল।

কোথায় চাহিদা, কিসের চাহিদা?

সারা বিশ্বে গরু-ছাগলের নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গের বাজার প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এই দুটি পণ্য প্রথমে রপ্তানি শুরু করেছিল চীন দিয়ে। এরপর এর সঙ্গে একে একে যুক্ত হয় হংকং, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং কোরিয়া। তবে এসব দেশ ছাড়াও আরও বেশ কিছু দেশে এই পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা এখন ইউরোপের বাজার দখলের কথাও ভাবছেন।

বিদেশে উন্নতমানের স্যুপ এবং সালাদ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ। বিশেষ করে ইউরোপীয় এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এসবের চাহিদা রয়েছে বেশ। নববর্ষ উপলক্ষে চীনে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গের চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ। জাপানের জনপ্রিয় ও দামি ‘শোস্যাট রোল’ নামের খাবারটিও গরু ও মহিষের নাড়িভুঁড়ি দিয়েই তৈরি। অন্যদিকে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, জাপান ও চীনে গরু-মহিষের পেনিস বা লিঙ্গ দামি ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কসাই থেকে আড়তদার হয়ে রপ্তানিকারকের হাতে

বাংলাদেশ গরু-ছাগলের নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ সাধারণত নদী-খাল কিংবা নালা-ডোবায় ফেলে দেওয়া হতো। এতে পরিবেশে দূষণ ঘটতো। তবে এসবের বাজার পাওয়ার পর এখন চিত্রটাই বদলে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখন কসাইদের কাছ থেকে সেগুলো সংগ্রহ করেন। এর দুই ঘণ্টার মধ্যে লবণ মাখানো হয় তাতে।

এরপর সেগুলো আড়তদারদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। রপ্তানিকারকদের কাছে বিক্রির উপযোগী করার জন্য সেখানে আরেক দফা প্রক্রিয়াজাত করা হয় সংগ্রহ করা নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গগুলো। প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে নাড়িভুঁড়ি থেকে বের করে ফেলা হয় চর্বি। সাধারণত এক টন নাড়িভুঁড়ি প্রক্রিয়াজাত করার পর ৭০০ কেজি পর্যন্ত পাওয়া যায়।

আড়তদারদের কাছ থেকে কেনার পর রপ্তানিকারকরা সেগুলো বিক্রয়যোগ্য করে তোলে কোল্ড স্টোরেজে রাখে। এভাবে ২৮ টন সমপরিমাণের নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ জমলে সেগুলো ভরা হয় কনটেইনারে। এই কনটেইনারই পরে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়।

কোথায় কতো দাম

নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গ সংগ্রহ থেকে রপ্তানি পর্যন্ত এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রামের ৫০টি গুদামে কাজ করছেন অন্তত পাঁচ হাজার শ্রমিক। ধারণা করা হয়, সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক এই খাতে কাজ করেন।

আড়তদাররা কসাই বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৭০ টাকায় কাঁচা (লবণাক্ত) লিঙ্গ কেনেন। প্রক্রিয়াজাতকরণের পর রপ্তানিকারকদের কাছে সেগুলো প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৫৫০-৬৫০ টাকায়। অন্যদিকে অপ্রক্রিয়াজাত কাঁচা (লবণাক্ত) নাড়িভুঁড়ি বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৪০০-৪৫০ টাকায়।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন নাড়িভুঁড়ি বাংলাদেশি টাকায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকায় বিক্রি হয়। অন্যদিকে লিঙ্গ বিক্রি হয় আরও বেশি দামে— বাংলাদেশি টাকায় ছয় থেকে সাত লাখ টাকায়।

হাজার কোটি টাকা আয়ের হাতছানি

বাংলাদেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ গবাদি পশু জবাই করা হয়, সেসবের নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গের সামান্যই সংগ্রহ করতে পারেন রপ্তানিকারকরা। বেশিরভাগই পরিত্যক্ত হিসেবে নদী-খাল কিংবা মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়। কোরবানির ঈদে জবাই করা পশুর নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গের মাত্র ১০ ভাগ সংগ্রহ করা সম্ভব হয় বিদেশে রপ্তানির জন্য।
এই খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নাড়িভুঁড়ি ও লিঙ্গের ১০০ ভাগ যদি রপ্তানি করা সম্ভব হয়, তাহলে কয়েক হাজার কোটি টাকা শুধু এ থেকেই আয় করা সম্ভব।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ManaratResponsive
1 মন্তব্য
  1. মোঃ মিজানুল হক বলেছেন

    আমি এই ব্যবসাটি করতে চাই আমাকে এখলাস সাহেবের সাথে যোগা যোগ করার একটা ব্যবস্থা করে দিন
    আমার মোবাইল নং ০১৯৫৪০৮৫৫৯৭

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন
ksrm