কিশোরমনে অপরাধের বীজ ঢুকিয়ে দিচ্ছে একঝাঁক ‘বড় ভাই’

কথিত বড় ভাইদের ছত্রচ্ছায়ায় এলাকায় চুরি-ছিনতাই-খুনের মত ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়া ছাড়াও সামান্য ঘটনায় খুন করে ফেলা বা বড় কোন অপরাধ সংঘটন করছে কিশোর অপরাধীরা। সম্প্রতি পরিবর্তিত হচ্ছে কিশোর অপরাধের ধরন। তুচ্ছ বিষয়ে কথা কাটাকাটি, ফেসবুক-মোবাইল, প্রেম, চুরি-ছিনতাইসহ নানা ইস্যুতে সামান্য মতানৈক্য হলেই এদের মাথায় খুন চাপে ওদের। কিশোররা প্রকাশ্যেই জড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতি সংঘাত ও হানাহানিতে।কিশোরদের নানামুখী অপরাধ কার্যক্রম ভাবিয়ে তুলছে নগরের সচেতন মহলকে।

২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান ইসপারকে প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করে হত্যার ঘটনার পর নগর দাপিয়ে বেড়ানো কিশোর অপরাধীদের নিয়ে নড়েচড়ে বসেছিল চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। পাড়ায়-পাড়ায় সক্রিয় কিশোর অপরাধী গ্রুপের (কিশোর গ্যাং) তালিকাও করা হয়েছিল। কিশোরদের আড্ডায় নিয়মিত হানা দিতেও শুরু করেছিল পুলিশ।

কিন্তু বর্তমানে কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশের এই কার্যক্রম কার্যত থেমে গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ কিশোর অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রক এলাকায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ এসব চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এসব কিশোর এবং সদ্য কৈশোর পার করা তরুণরা রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতেও সক্রিয়। ফলে চট্টগ্রাম নগরীর পাড়ায়-পাড়ায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কিশোর অপরাধ। কিশোররা গ্যাং গঠন করে বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত হচ্ছে।

পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, নগরীতে অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাং আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় চট্টগ্রাম নগরীতে কিশোর অপরাধীদের সন্ধানে নেমেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)। পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় হচ্ছে পুলিশও।

কিশোর অপরাধের সর্বশেষ বলি জাকির হোসেন সানি (১৮)। সোমবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে নগরের খুলশী থানার জাকির হোসেন সড়কে ওমরগণি এমইএস কলেজের ফটকের অদূরে ইক্যুইটি ভবনের সামনে ছুরিকাঘাতে খুন হয় সানি। এ খুনের নেপথ্যে বেসরকারি ওমরগণি এমইএস কলেজকেন্দ্রিক ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের বিরোধের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

নিহতের পরিবার বলছে, প্রেমসংক্রান্ত কারণে তাকে খুন করা হয়েছে। সানি ঢাকার মিরপুরের একটি স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র।

গত বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) বড় ভাইয়ের ছত্রচ্ছায়ায় চুরি করা ৩ কিশোরকে আটক করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। আটককৃতরা চুরি করলেও ফায়দা হাসিল করে ওই বড় ভাইরা—এমন তথ্য উঠে আসে আটককৃতদের স্বীকারোক্তিতে।

তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, স্থানীয় এক ‘বড় ভাই’য়ের ছত্রচ্ছায়ায় চুরি করেন তিনি। চুরির পর এসব মালামাল জমা দেওয়া হয় ওই বড় ভাইকে। শুধু তারাই নয়, কৈশোর পার হওয়া একদল তরুণকে দিয়ে শহরজুড়ে এই চুরির কাজ করান কথিত ‘বড় ভাই’। নিয়মিত চুরি করার কথা স্বীকার করে ও চুরির কৌশল তুলে ধরে বুধবার (২১ আহস্ট) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার জাহানের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আটককৃত কিশোররা।

তারা জবানবন্দিতে বলে, বগারবিলের এক ‘বড় ভাইয়ের’ আশ্রয়ে গত ৩-৪ বছর ধরে চুরি করে তারা। যা পাওয়া যেতো সব কিছুই বড় ভাইকে জমা দেওয়ার পর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেয়া হতো তাদেরকে৷

এর আগে গত (১৬ আগস্ট) বৃহস্পতিবার গভীর রাতে নগরীর আগ্রাবাদ মৌলভীবাজার তিন রাস্তার মোড় থেকে মেয়েঘটিত বিষয় নিয়ে মারামারির অভিযোগে সোহাগ গ্রুপের আট সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা সদ্য কৈশোর পার হওয়া তরুণ আর কিশোর বলে জানিয়েছেন পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছেন, এলাকায় তারা সোহাগ গ্রুপ নামে পরিচিত। তারা নগরের আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ পর্যায়ের নেতার অনুসারী হিসেবে এলাকায় নিজেদের প্রচার করে। তারা রাজনৈতিক মিছিল,সভা-সমাবেশে অংশ নেয় বলেও জানায় পুলিশ।

এলাকাবাসীরাও এসব কিশোরদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না। এলাকার বাসিন্দা অনেক ভদ্রলোক তাদের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন। ইচ্ছে হলেই যে কাউকে ধরে নিয়ে পেটায় তারা। রাস্তায় তুচ্ছ বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে এসব কিশোর।

গত (১৮ জুলাই) বৃহস্পতিবার গভীর রাতে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী থানার দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় একটি কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে অর্ন্তদ্বন্দ্বের জেরে খুন হয়েছে এক তরুণ। পুলিশ জানিয়েছে, এই কিশোর গ্যাং চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। খুন হওয়া সদ্য কৈশোর পার করা তরুণসহ গ্যাংয়ের সব সদস্যই বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

গত তিন মাসে এই ধরনের আরও বেশ কয়েকটি ঘটনার পর চট্টগ্রাম নগরীতে ‘কিশোর গ্যাং কালচার’ আবারও আলোচনায় আসছে।

পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আদনান ইসপার হত্যার পর নগর পুলিশ অপরাধ চক্রে জড়িত কিশোর এবং অপরাধপ্রবণ এলাকার তালিকা করেছিল। তালিকায় প্রায় ৫৫০ জন কিশোরের নাম এসেছিল। অপরাধপ্রবণ স্পট, যেখানে নিয়মিত আড্ডা বসে, এই ধরনের স্পটের নাম এসেছিল প্রায় ৩০০। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন স্পটে আড্ডারত কিশোর-তরুণ দেখলে আটকের কথাও ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল নগর পুলিশের পক্ষ থেকে।

এসব কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের জন্য নগরীর লালখানবাজার, চকবাজার, নন্দনকানন, সিআরবি, বিশ্বকলোনি, বহদ্দারহাট, পলিটেকনিক এলাকার কয়েকজন আওয়ামী লীগ-যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতার নাম পেয়েছিল পুলিশ। কিশোর-তরুণ অপরাধীদের যারা নিয়ন্ত্রক, তাদের প্রভাব অনেক বেশি। এর ফলে কিশোরদের অপরাধ দমনের বিষয়টি দিন দিন বেড়েই চলছে।

পুলিশ সূত্র মতে, কোচিংভিত্তিক, রাজনৈতিক, স্কুল-কলেজভিত্তিক, চাকরিজীবী- এই ধরনের অন্তত ১৫টি ক্যাটাগরির আড্ডার স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল। তালিকা তৈরির পর কয়েকমাস স্পটগুলো নিয়মিত পুলিশের নজরদারিতে ছিল। কিন্তু এখন সেই আড্ডাস্থলগুলো আবারও সরব কিশোর-তরুণদের আনাগোণায়। তুচ্ছ বিষয়ে কথা কাটাকাটি, ফেসবুক-মোবাইল, প্রেম, চুরি-ছিনতাইসহ নানা বিষয়ে সামান্য মতানৈক্য থেকে কিশোর-তরুণরা জড়াচ্ছে প্রাণঘাতি সংঘাতে। গত দেড় বছরে কমপক্ষে ২৫টি মামলা হয়েছে সরাসরি কিশোর অপরাধের জন্য। এছাড়া ছিনতাইয়ের অধিকাংশ মামলাতেই আসামির তালিকায় থাকছে কিশোর অপরাধীর নাম।

সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আমেনা বেগম বলেন, ‘আমরা কিন্তু ঘটনা ঘটলেই অ্যাকশনে যাচ্ছি। এখন অভিভাবক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু পুলিশি অ্যাকশন দিয়ে তো এই ধরনের সামাজিক অপরাধ একেবারে নির্মূল করা সম্ভব নয়। এছাড়া তাদের যারা নিয়ন্ত্রক, তাদেরও আমরা আইনের আওতায় আনার কাজ করছি।কিশোর অপরাধী এবং অপরাধপ্রবণ স্পটগুলোর তালিকা আমাদের কাছে আছে। সেই তালিকা ধরে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাই। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যেসব স্পটে কিশোর-তরুণরা নিয়মিত আড্ডা দেয়, সেই স্পটগুলো আমাদের নজরদারিতে আছে।’

র‌্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক এএসপি মো.মাশকুর রহমান বলেন,‘সদর দপ্তরের নির্দেশে আমরা কিশোর অপরাধী চক্রের তালিকা করতে শুরু করেছি। মূলত নগরীর যেসব স্পটে কিশোর-তরুণদের আনাগোনা বেশি থাকে এবং অপরাধ সংঘটিত হয়, সেসব স্পটকে আমরা আমাদের নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করছি। নগরীর ১৬ থানা এবং জেলার ১৬ থানা এলাকা থেকেই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ‘সন্তান লালন পালন বা প্যারেন্টিং খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। আমরা নিজেদের সন্তানকে ঠিকমতো সময় দিই না।আমরা নিজেদের পিতামাতার কাছে যতটা পেয়েছি অন্তত ততটা সন্তানকে দিতে হয়। সন্তানকে মূল্যবোধ শেখাতে হলে তারে আবেগিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে পরিপূরক হিসেবে ভূমিকা রাখতে হয়। তার সাথে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিবর্তনশীল মনোভাবে সন্তানের ভালোলাগার ও মন্দলাগাকে বুঝতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সন্তানের গতিবিধি লক্ষ্য করা।’

সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কেই কিশোর অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি পারিবারিক গণ্ডিতে সঠিক শিক্ষার অভাবেও অনেকাংশে কিশোর অপরাধের জন্য দায়ী। আবার মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত অনেকেই নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের অপরাধ জগতে টানছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের ব্যবহার করেন। ফলে একসময় এই কিশোররা পরিবারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন শুধু পাড়া-পড়শির নয়, নিজের পরিবারের জন্যও তারা হয়ে বিপজ্জনক ওঠে।
কিশোররা বর্তমানে অনেক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কিশোর অপরাধ প্রবণতা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফেসবুকের মাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে নানা অপরাধ করছে কিশোররা। বাড়ছে কিশোর অপরাধ।

এইচটি/এসএস

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!