প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই, পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টিরও চার বছর গত হয়েছে। এমনকি ডিজিটাল মিটারে অস্বাভাবিক বিল আসা নিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তি এখন চরমে। ঠিক এমন এক সময়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ডানা মেলছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার তিন কর্মকর্তা। ডিজিটাল মিটার সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারিগরি ও সফটওয়্যার প্রশিক্ষণে অংশ নিতে তাদের এই বিদেশযাত্রা।
অবাক করার মতো তথ্য হলো, যে প্রকল্পের প্রশিক্ষণে তারা যাচ্ছেন, সেই মিটার বসানোর কাজ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এমনকি পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টির চার বছরই পার হয়ে গেছে। খোদ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ পরিহারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও সেই বিধিনিষেধ তোয়াক্কা না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের টাকায় আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছেন তারা। ঠিকাদারের টাকায় কর্মকর্তাদের এই ‘প্রমোদভ্রমণ’ নিয়ে এখন ওয়াসার অন্দরেই শুরু হয়েছে নানা গুঞ্জন।
প্রকল্পের কাজ শেষ, তবুও প্রশিক্ষণ
চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, নগরীর চান্দগাঁও ও আগ্রাবাদ এলাকায় তিন হাজার মিটার বসানোর মাধ্যমে স্মার্ট মিটার প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হয়েছিল। ২০২২ সালে ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ে হাতে নেওয়া এই পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় সাড়ে তিন বছর সময় লাগে। চলতি বছরের মে মাসে এই প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে বিলিং কার্যক্রমও চলমান। অথচ কাজ শেষ হওয়ার পর এখন কারিগরি ও সফটওয়্যার প্রশিক্ষণের নাম করে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামার লুৎফি জাহান। তাদের সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন প্রতিনিধিও যোগ দিচ্ছেন।
ওয়াসার এক অফিস আদেশে জানানো হয়েছে, ডিজিটাল মিটার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান উইংস ইনভেস্টমেন্ট এলএলসি এই সফরের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবে। এতে বাংলাদেশ সরকার বা চট্টগ্রাম ওয়াসার কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই।
কারিগরি জ্ঞানহীন কর্মকর্তাদের সফর
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী তিন কর্মকর্তার মধ্যে কেবল একজন সফটওয়্যার কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বাকি দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিভাগের। কারিগরি প্রশিক্ষণে নন–টেকনিক্যাল কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম জানান, বিষয়টি তার জানার কথা নয়। চট্টগ্রাম ওয়াসা থেকে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেই তিনি যাচ্ছেন। এমনকি এই প্রশিক্ষণ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না বলেও স্বীকার করেছেন।
একই সুরে কথা বলেছেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে। তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তার নাম নির্বাচন করেছে। ডিজিটাল মিটারের কার্যক্রমের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত না থাকলেও নাম আসায় তিনি সফরে যাচ্ছেন। কেন তাকে পাঠানো হচ্ছে, সেই উত্তর তার কাছে নেই।
ঠিকাদারের টাকায় ভ্রমণবিলাস
ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গত ২৩ মার্চ জারি করা এক পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়, ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ অবশ্যই পরিহার করতে হবে। জরুরি কারণ ছাড়া উপদেষ্টা বা সচিবদের সহযাত্রী হিসেবে কাউকে বিদেশ নেওয়া যাবে না এবং পরিবারের সদস্যদের সফরসঙ্গী করা যাবে না। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই ঠিকাদারের টাকায় ১৫ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন এই কর্মকর্তারা।
ওয়াসার অনেক কর্মকর্তার মতে, ঠিকাদারের টাকায় বিদেশ ভ্রমণের ফলে পণ্যের মান নিয়ে আপস করার প্রবণতা তৈরি হয়। কোনো কোম্পানি থেকে সুবিধা নেওয়ার পর তারা নিম্নমানের পণ্য দিলেও অনেক সময় কর্মকর্তাদের চুপ থাকতে হয়।
উগান্ডাকাণ্ডে ছয় বছর আগেও তোলপাড়
চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ইতিহাস বেশ পুরনো। বিশেষ করে ২০১৯ সালে উগান্ডা সফর করে তারা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। সেবার ওয়াসার ২৭ জন কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের জন্য উগান্ডা গিয়েছিলেন, যা নিয়ে ওয়াসা বোর্ডেই প্রশ্ন উঠেছিল।
বর্তমান ডিজিটাল মিটার প্রকল্পটিও গ্রাহকদের কাছে ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, স্মার্ট মিটার লাগানোর পর থেকে বিল আগের তুলনায় চার গুণ বেড়ে গেছে। কোথাও অস্বাভাবিক কম বিল আসছে। ওয়াসায় অভিযোগ করেও কোনো সমাধান না পেয়ে গ্রাহকরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকে ডিজিটাল মিটার বদলে আগের মিটার লাগাতে চাইলেও ওয়াসা তা নাকচ করে দিয়েছে।
অনিশ্চয়তায় পরবর্তী প্রকল্প
পাইলট প্রকল্পের এই ত্রুটিপূর্ণ অভিজ্ঞতার মধ্যেই বিশ্বব্যাংকের ঋণে আরও প্রায় ১ লাখ স্মার্ট মিটার বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। তবে পাইলট প্রকল্পের মিটারে রিডিং ত্রুটি ও বিল বেশি আসার অভিযোগ থাকায় নতুন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে খোদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
প্রকল্পের কারিগরি ত্রুটি সম্পর্কে চট্টগ্রাম ওয়াসার কম্পিউটার প্রোগ্রামার লুৎফি জাহান জানান, কিছু মিটারে ত্রুটি ছিল যা ওয়ারেন্টির আওতায় পরিবর্তন করে দেওয়া হবে। তবে মাঠ পর্যায়ে গ্রাহকদের দুর্ভোগ ও বিলিং সিস্টেমের জটিলতা এখনও কাটেনি। এই অব্যবস্থাপনার মধ্যেই ঠিকাদারের খরচে কর্মকর্তাদের বিদেশযাত্রা সচেতন মহলে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
সিপি




