কলবের পরিশুদ্ধি ও মরমী সাধনা: বাংলায় ইসলাম প্রসারের নেপথ্য কারিগর
মানুষের শরীরে একটি বিশেষ অঙ্গ রয়েছে, যা সুস্থ থাকলে পুরো দেহই পরিশুদ্ধ থাকে, আর সেটি অসুস্থ হয়ে পড়লে সবটাই কলুষিত হয়ে যায়। ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কালজয়ী সেই বাণী অনুযায়ী, মানুষের হৃদপিণ্ড বা কলবকে কলুষমুক্ত রাখাই সুফিবাদের মূল লক্ষ্য। অশান্ত জনপদ আর নিপীড়িত মানুষের এই বঙ্গভূমিতে ইসলামের শান্তির বার্তা নিয়ে এক সময় হাজির হয়েছিলেন একদল মহান সুফি-সাধক। মূলত তাঁদের আত্মনিবেদিত প্রচেষ্টায় এবং মহান আল্লাহর স্মরণে জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমেই এই জনপদে ইসলামের একচ্ছত্র প্রসার ঘটেছিল।
কলবের পরিশুদ্ধি ও সুফিবাদ
সুফিবাদ মূলত একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শন, যার মুখ্য বিষয় হলো আত্মা নিয়ে নিবিড় আলোচনা। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই এই দর্শনের মূল কথা। ‘সুফ’ শব্দের অর্থ পশম এবং ‘তাসাউফ’ বলতে পশমি বস্ত্র পরিধানের অভ্যাসকে বোঝানো হয়। আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া ব্যক্তিকে সুফি বলা হয়। তাসাউফ দর্শনের মূল ভিত্তি হলো আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমে ‘ফানাফিল্লাহ’ অর্জন করা এবং পরবর্তীতে ‘বাকাবিল্লাহ’ লাভ করে আল্লাহর সঙ্গে স্থায়ীভাবে বিলীন হওয়া। যেহেতু স্রষ্টা নিরাকার, তাই তাঁর প্রেমই হলো মিলনের একমাত্র মাধ্যম। এই সাধনাকে ‘তরিকত’ বলা হয়, যেখানে একজন মুর্শিদের প্রয়োজন পড়ে। সুফিরা বিশ্বাস করেন, বাকাবিল্লাহ অর্জিত হলে আল্লাহর বিশেষ শক্তিতে তাঁরা শক্তিমান হন এবং তাঁদের অন্তরে চিরস্থায়ী শান্তি ও আনন্দ বিরাজ করে।
বাংলায় ইসলামের পদধ্বনি
বাংলায় ইসলামের আগমনের সঠিক সময় নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক থাকলেও বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই চট্টগ্রাম উপকূলে আরব বণিকদের মাধ্যমে ইসলামের আলো পৌঁছেছিল। সমুদ্রপথে চীন যাওয়ার পথে সাহাবি ও তাবেয়িদের একটি দল এখানে যাত্রাবিরতি করেছিলেন বলেও ধারণা করা হয়। তবে সুফিবাদ উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি-সাধক ও কবি-দার্শনিকদের লেখনীর মাধ্যমে এই দর্শন সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কালক্রমে বিখ্যাত অলিদের কেন্দ্র করে চারটি প্রধান তরিকা গড়ে ওঠে, যা হলো বড় পীর হজরত আবদুল কাদির জিলানি (র.) প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা, সুলতানুল হিন্দ হজরত খাজা মু’ঈনুদ্দীন চিশতি (র.) প্রতিষ্ঠিত চিশতিয়া তরিকা, হজরত খাজা বাহাউদ্দিন নকশবন্দি (র.) প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দিয়া তরিকা এবং হজরত শেখ আহমদ মুজাদ্দিদ-ই-আলফে ছানি সারহিন্দি (র.) প্রতিষ্ঠিত মুজাদ্দিদিয়া তরিকা। এ ছাড়াও সুহরাওয়ার্দি, মাদারিয়া, আহমদিয়া ও কলন্দরিয়া তরিকারও উদ্ভব ঘটেছিল।
মরমী সাধকদের অবদান
খ্রিষ্টীয় একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে আরব, ইয়েমেন, ইরাক, ইরান ও মধ্য এশিয়া থেকে দলে দলে সুফিরা এই দেশে আগমন করেন। তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন হজরত শাহ সুলতান রুমি (র.), হজরত বাবা আদম শহিদ (র.), হজরত শাহ সুলতান বলখি (র.), হজরত শাহ নিয়ামাতুল্লাহ বুতশেকন (র.), হজরত শাহ মখদুম রুপোশ (র.), হজরত শেখ ফরিদউদ্দিন শক্করগঞ্জ (র.) এবং হজরত মখদুম শাহ দৌলা শহিদ (র.)। পরবর্তী সময়ে হজরত শেখ জালালুদ্দিন তাব্রিজি (র.), হজরত শাহ জালাল (র.), হজরত শাহ পরান (র.), হজরত শাহ কারামত আলী জৌনপুরী (র.), হজরত খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী (র.), হজরত শেখ আলাউল হক (র.), হজরত খান জাহান আলী (র.), হজরত শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (র.) ও হজরত শাহ ফরিদউদ্দিন (র.) ইসলামের প্রসারে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। তাঁদের আধ্যাত্মিক প্রভাবে অনেক সময় অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়, যেমন আজানের ধ্বনিতে গৌড় গোবিন্দের প্রাসাদ ধ্বংস হওয়ার লোকগাথা।
মানবসেবা ও সামাজিক প্রভাব
সুফিদের আস্তানা বা খানকাগুলো কেবল ইবাদতের কেন্দ্র ছিল না, বরং সেগুলো ছিল জ্ঞান ও শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। এসব খানকায় ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে অসহায় ও দুস্থ মানুষের জন্য বিনামূল্যে খাবারের লঙ্গরখানা খোলা থাকত। সুফিরা অন্য ধর্মের প্রতি কখনো বিদ্বেষ পোষণ করেননি, বরং তাঁদের চারিত্রিক মাধুর্য ও সাম্যের বাণীতে মুগ্ধ হয়ে হিন্দু, বৌদ্ধ ও সমাজের অবহেলিত মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলায় ইলিয়াস শাহী আমলে যখন হিন্দু আধিপত্য বৃদ্ধি পায়, তখন সুফিরাই ইসলামের পথ প্রশস্ত করেন। তাঁরা সরাসরি শাসনকাজে না থাকলেও শাসক শ্রেণিকে নৈতিক সহযোগিতা প্রদান করতেন। সুফিবাদ ও সন্ন্যাসবাদ এক নয়; সন্ন্যাসীরা সংসার ত্যাগ করলেও সুফিরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েন এবং সংসারের দায়িত্ব পালন করেই স্রষ্টাকে খুঁজে বেড়ান।
লৌকিক ঐতিহ্যে সুফি প্রভাব
বাংলার লোকসংস্কৃতিতে সুফি-দরবেশদের প্রভাব আজও অম্লান। নদীপথে চলাচলের সময় মাঝিরা আজও ‘বদর পীরের’ নাম স্মরণ করে, এমনকি শহরের যানবাহনেও পীর-আউলিয়াদের নাম লেখা থাকে। লৌকিক ধারার মুর্শিদি-মারফতি গান, গাজির গান, গাজিকালু-চম্পাবতী কাব্য কিংবা মাদার পীরের গানের মূলে রয়েছেন এই সাধকরাই। হজরত শাহজালাল (র.) বা হজরত শাহ মকদুম (র.)-এর মাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর ভক্তি প্রমাণ করে যে, সুফিদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও জনমনে গেঁথে আছে। যদিও বর্তমান বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির প্রভাবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তবুও সুফিবাদ আজীবন ইমান হিফাজত ও কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে এক নিরন্তর যুদ্ধের নাম হয়ে টিকে আছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সুফিরা অনেক চিকিৎসালয় ও আশ্রয়স্থল নির্মাণ করে গেছেন, যা তৎকালীন সমাজ ও শাসকবর্গের কাছে তাঁদের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থানে নিয়ে গিয়েছিল।
লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট




