কর্ণফুলীতে ইজারার বাইরে ‘অস্থায়ী’ তকমায় দুই বাজার, রাজস্বের অঙ্কে বড় গরমিল
মহাসড়কের পাশে বাজার, দায় এড়াচ্ছে প্রশাসন
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় হাট-বাজার ইজারা প্রক্রিয়াকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, শিকলবাহা ক্রসিং ও ফকিরন্নিরহাট রাস্তার মাথা হাট—এই দুই স্থায়ী বাজারকে ‘অস্থায়ী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে নিয়মিত ইজারা প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে দরপত্রের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের পরিবর্তে ‘খাস আদায়’ পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় হাট-বাজার ইজারা প্রক্রিয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিকলবাহা ক্রসিং ও ফকিরন্নিরহাট রাস্তার মাথা হাট—এই দুই স্থায়ী বাজারকে ‘অস্থায়ী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে নিয়মিত ইজারা প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক ইজারার বদলে ‘খাস আদায়’ পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ইজারা তালিকায় নেই দুই বাজার
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই প্রক্রিয়া নতুন নয়। আগের ইউএনওর সময়েও বাজার দুটি একইভাবে ইজারার বাইরে ছিল। অথচ সরকারি নীতিমালায় স্থায়ী বাজারকে অস্থায়ী দেখিয়ে ইজারা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সমালোচকদের ভাষ্য, এটি প্রশাসনিক বিচক্ষণতার বিষয় নয়; বরং দায় এড়ানোর প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে উপজেলার অন্যান্য বাজারের সরকারি মূল্য লাখ থেকে কোটি টাকা ছুঁইছুঁই, সেখানে এই দুটি বাজার কখনো ইজারা দেওয়া হয়নি কেন।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের হাট-বাজার ইজারা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে কর্ণফুলীর ৯টি বাজারের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৩ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন ধাপে দরপত্র জমা ও খোলার সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী চরলক্ষ্যা মইজ্যারটেক হাটের সরকারি মূল্য ২ কোটি ৮৫ লাখ ১৫ হাজার টাকা, সিডিউল মূল্য ৫৭ হাজার ৮০০ টাকা। ফকিরনীর হাট বড়উঠান বাজারের সরকারি মূল্য ৬৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা, সিডিউল ১৩ হাজার ৬০০ টাকা। বড়উঠানের ফাজিলখার হাটের মূল্য ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, সিডিউল ২ হাজার ৪০০ টাকা। জুরধা পাইপের গোড়া বাজারের সরকারি মূল্য ৬ লাখ ২ হাজার টাকা, সিডিউল ২ হাজার টাকা। চরলক্ষ্যা বোর্ড বাজারের মূল্য ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা, সিডিউল ১ হাজার ২০০ টাকা। শিকলবাহা মাস্টারহাটের সরকারি মূল্য ৯১ হাজার টাকা, সিডিউল ৫০০ টাকা। শিকলবাহা কলেজ বাজারের সরকারি মূল্য ২৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, সিডিউল ৬ হাজার ৬০০ টাকা। এসব অঙ্ক থেকেই হাট-বাজারগুলোর রাজস্ব সম্ভাবনা স্পষ্ট।
কিন্তু একই বিজ্ঞপ্তির ৮ ও ৯ নম্বর ক্রমিকে মন্তব্যের ঘরে উল্লেখ করা হয়েছে, অস্থায়ী বাজার বিগত বছরগুলোতে ইজারা না হওয়ায় সরকারি ভাবে খাস আদায় করা হয়েছে এবং অস্থায়ী বাজার বিধায় খাস আদায় করা হবে। এখানেই মূল প্রশ্ন। বছরজুড়ে নিয়মিত বসা, তিন শতাধিক দোকানসমৃদ্ধ এবং লাখ লাখ টাকার লেনদেন হওয়া বাজার কীভাবে অস্থায়ী থাকে।
খাস আদায়ের অঙ্কে অস্পষ্টতা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিকলবাহা ক্রসিং এলাকায় সপ্তাহে দুই দিন সোম ও শুক্রবার বসা হাটে প্রায় দেড়শ দোকান বসে। প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় হয়। ধারণা অনুযায়ী বছরে প্রায় ৯ লাখ টাকার বেশি আদায় সম্ভব, পাঁচ বছরে যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। এই অর্থের পুরোটা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে কি না, তার স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি। ফকিরন্নিরহাট রাস্তার মাথা হাটেও সপ্তাহে রোববার ও বুধবার দেড় শতাধিক দোকান বসে। এই বাজারের আদায়ের অর্থ কোন পথে গেছে, তারও সুস্পষ্ট হিসাব মিলেনি।
বিগত পাঁচ বছরের আদায়ের হিসাব ও জমা দেওয়ার তথ্য জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব কান্তি রুদ্র নির্দিষ্ট তথ্য দেননি বলে অভিযোগ। গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং সময়ক্ষেপণ করেন। উপজেলার অন্যান্য কর্মকর্তারাও উপরের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
সড়ক নিরাপত্তায় ঝুঁকি
বাজার বসার কারণে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট ও দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাঁদের ভাষ্য, সৌদিয়া বাস ও পিকআপের সংঘর্ষে কয়েক মাস আগে জামাল উদ্দীন, ৩৫ এবং মোটরসাইকেল আরোহী এসএম খোরশেদুল আলম, ৪২ নিহত হন। আহত হয়েছেন একাধিক পথচারী। ২০২৩ সালের সংশোধিত মহাসড়ক আইন অনুযায়ী মহাসড়কের ১০ মিটারের মধ্যে বাজার বা অবকাঠামো স্থাপন নিষিদ্ধ থাকলেও শিকলবাহা ক্রসিং ও ফকিরনীরহাট রাস্তার মাথায় নিয়মিত বাজার বসছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ওসমান বলেন, বাজারটি অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসনের নীরবতা দুঃখজনক। মহাসড়কে প্রতিদিন প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি বাজার সরিয়ে সরকারি খাস জমিতে স্থানান্তর করে ইজারা দেওয়ার দাবি জানান এবং কর্ণফুলী উপজেলা সৃষ্টির আগ থেকেই এসব বাজার নিয়মিত বসে আসছে উল্লেখ করেন।
যা বলছে দপ্তরগুলো
শিকলবাহা ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মৌসুমী বড়ুয়া জানান, তিনি এক বছর আগে যোগদান করেছেন এবং ক্রসিং বাজার থেকে খাস আদায় করে উপজেলায় জমা দেন। বিস্তারিত হিসাব সম্পর্কে জানতে হলে উপজেলায় যোগাযোগ করতে বলেন। বড়উঠান ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পটিয়া ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হারুনুর রশিদ বলেন, বাজারটি তাঁদের জুরিডিকশনের বাইরে। এ বিষয়ে কর্ণফুলী থানা, উপজেলা প্রশাসন ও সড়ক বিভাগ ব্যবস্থা নিতে পারে। কর্ণফুলী থানার ওসি শাহীনুর জানান, তিনি কয়েক মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন।
উপজেলা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার, ভূমি মো. আল আমিন হোসেন বলেন, বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বৈঠক হয়েছে এবং শিগগিরই সিদ্ধান্ত হবে। গত ছয় মাসে যা আদায় হয়েছে তা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে এবং তহসিলদারগণ যে হিসাব জমা দিয়েছেন, সেটুকুই তাঁদের জানা আছে। তিনি স্বীকার করেন, সড়কে বাজার রাখা ঝুঁকিপূর্ণ এবং খাস জমিতে স্থানান্তরের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে।
ইউএনও সজীব কান্তি রুদ্র বলেন, ২০ থেকে ৩০ বছর আগে সড়কের ওপর ক্রসিং বাজার বসত কি না তিনি জানেন না, বর্তমানে সড়কের পাশে বসে। যেকোনো সময় তুলে দেওয়া হতে পারে বলে স্থায়ী করা হয়নি। বাজার দুটি স্থায়ী করা যায় কি না, সে বিষয়ে চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, ২০২৩ সালের সংশোধিত মহাসড়ক আইন অনুযায়ী মহাসড়কের ১০ মিটারের মধ্যে কোনো বাজার বা স্থাপনা বসানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, রাজস্ব সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
একটি বাজার স্থায়ী না অস্থায়ী, তা নির্ধারণের প্রশাসনিক মানদণ্ড থাকলেও সেই মানদণ্ড প্রকাশ না করে বাজারকে ইজারা প্রক্রিয়ার বাইরে রাখায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রস্তাব, বাজারগুলো মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নির্ধারিত খাস জমিতে স্থানান্তর করে নিয়মিত ইজারার আওতায় আনা হোক। এতে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও স্বচ্ছতা ফিরবে।




