করোনায় বদলে যাওয়া এক বিকেলের চট্টগ্রাম

চেনা ব্যস্ততার বদলে শীতল আতঙ্কের শূন্যতা

0

ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৫টা। নগরীর বহদ্দারহাট মোড়। কালুরঘাটমুখী এক নম্বর মিনিবাসে বসে আছে তিনজন যাত্রী। তাদের গাড়িতে বসিয়ে হেলপার রবিউল হাঁক দিচ্ছেন অন্য যাত্রীর খোঁজে। কিন্তু তার ডাকে সাড়া দেওয়ার মত মিলছে না কেউ। দশ মিনিট ধরে তার হাঁকডাকে যাত্রীর সাড়া না মিললেও তার পিছনে এসে দাড়িয়ে গেল আরও দু’টি বড় বাস। তার একটিতে পাঁচজন, অন্যটিতে বসে আছে হাতেগোনা আটজন।

শুধু এ রুটেই নয়, নগরী সবকটি রুটেই যাত্রীর জন্য হাহাকার বাস-টেম্পোর চালক-হেলপারদের। যাত্রী না মিললে পেটেও যে তাদের মিলবে না খাবার!

বাস হেলপার রবিউলের সাথে কথা বলে জানা গেলো, রোববার থেকে এমন অবস্থা। এর আগের দিন যাত্রী কম থাকলেও সিট ভর্তি হয়েছে। আজ সারাদিনের প্রতিটি ট্রিপেই একই অবস্থা। এক ট্রিপে আগে মিলতো তিন থেকে সাড়ে তিন’শ টাকা। এখন এক থেকে দেড়’শ টাকা। গাড়ির গ্যাসের টাকা, মালিকের ভাড়াই তোলা যাচ্ছে না সারাদিন গাড়ি চালিয়ে।

বহদ্দারহাট থেকে নিউমার্কেট আমতল পর্যন্ত আছে একটি টেম্পো রুট। এই রুটের যাত্রীরা বহদ্দারহাট পুলিশ বক্সের সামনে থেকেই উঠেন টেম্পোতে। ওই সময়ে দেখা গেল, ১৩টি টেম্পো জড়ো হয়েছে একসঙ্গে। কিন্তু যাত্রী আছে ৪টি টেম্পোতে। তাও আবার তিন চার জন করে প্রতিটিতে।

টেম্পোচালক রানা বলেন, সাধারণ সময়ে এই মোড়ে যাত্রী থাকে, কিন্তু গাড়ি থাকেনা। ১২ সিটের গাড়ির পা’দানিতেই ঝুলে তিন থেকে চারজন। আর এখন ছয়-সাত জন নিয়েই রওনা দিতে হয়।

বহদ্দারহাট-নতুনব্রিজ রুটে দুইটি মিনিবাস, ৪টি সবুজ টেম্পোর হেল্পার যাত্রী ডাকছিলেন। বিপরীত দিকে আগ্রাবাদমুখী ১০ নম্বর গাড়িটিতেরও যাত্রী ছিল অর্ধেক। তবুও রওনা দিয়েছে ওই বাসটি। অথচ এই রুটেও যাত্রীর চাপ এমন ছিল, সিটে যে পরিমাণ যাত্রী বসে তার সমান সংখ্যক যাত্রী গাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এই রুটে সিট ক্যাপাসিটির মেট্রোপ্রভাতীতে আগে দাঁড় করিয়ে যাত্রী পরিবহন করার প্রবণতা ছিল। কিন্তু তাদের বাসেও এখন যাত্রী মিলছে না আগের মত।

বিকেল সোয়া ৫টা, মুরাদপুর মোড়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়মুখী একটি তরী, তার পিছনে রাউজানমুখী, তার পিছনে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়গামী মিনিবাস দাঁড়িয়ে। তিনটা বাসেরই অর্ধেক খালি। অক্সিজেনমুখী ২টি টেম্পোতে এই চিত্র। একটিতে ৬ জন, আরেকটিতে ৩ জন নিয়ে যাত্রী ডাকছেন হেলপার।

বিকেল সাড়ে ৫টা, ষোলশহর ২ নম্বর গেইট
একই দৃশ্য মিলেছে বিকেল সাড়ে ৫টায় ষোলশহর ২ নম্বর গেইট মোড়ে গিয়েও। অক্সিজেনমুখী ১টি একটি বাস, একটি লেগুনার হেলপার যাত্রী ডাকছেন। জিইসিমুখী রুটে অর্ধেক খালি দুটি বাসের হেল্পারকেও যাত্রী ডাকতে দেখা গেছে।

শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা এই রুটের প্রধান যাত্রী। মোড়টিতে দিনভর লেগে থাকে যানজট। কিন্তু ওই মুহুর্তের পরিস্থিতি ছিল প্রায় হরতালের মতই। কারণ শ্রমিক কিংবা যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়নি ওই সময়ে। দুই নম্বর গেট চাপমুক্ত হয়ে দাড়িয়েছিলেন দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, করোনাভাইরাসের কারণে গত কয়েকদিন এই রুটের যাত্রী নেমেছে অর্ধেকে। তাই যানজট নেই এখন। তবে ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিতই থাকছে যানবাহন তদারকিতে।

জিইসি-ওয়াসা থেকে আগ্রাবাদ
এভাবে প্রায় এ ঘন্টা নগরীর জিইসি, ওয়াসা, লালখান বাজার, টাইগারপাস, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে একই চিত্র। সাধারণত এই মোড়গুলোতে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত লেগে থাকে যানজট। একটি মোড় পার হতেই সময় লাগতো ৩০ মিনিট কিংবা ১ ঘন্টা। গত কয়েকদিন এসব মোড় নিমিষেই পার হচ্ছ যানবাহন।

৩ নম্বর রুটের মিনিবাস চালক মো. রফিক বলেন, আমাদের এই রুটে এমন ফাঁকা কখনোই থাকেনা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কমপক্ষে ৫ বার আপডাউন করি। যাত্রী না থাকায় আজ তিনবার আপডাউন করেছি। একবারও ভরপুর যাত্রী পাইনি।

মোড়ে মোড়ে একেক দৃশ্য
বিকেলে দামপাড়া ওয়াসা মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক কনস্টেবল আবু তাহের জানান, সারাদিনে ওয়াসা মোড়ে কোন যানজটও ছিল না। গণপরিবহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে ব্যক্তিগত গাড়িও।

নিউমার্কেট মোড়ে কর্মরত ট্রাফিক কনস্টেবল মো. ইয়াসিন জানান, দিনের অনেকটা সময় যানজটে নাকাল থাকা নিউমার্কেট মোড় আজ অনকেটাই ফাঁকা। সারাদিন কোন যানজট ছিল না।

তবে দিন শেষে আগ্রাবাদ মোড় সরগম হয়ে ওঠে ইপিজেড আর বন্দর ফেরত গাড়ির চাপে। ইপিজেড’র শ্রমিক পরিবহনের পাশাপাশি ওই রুটে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপও ছিল উল্লেখ্যযোগ্য।

সিএমপি’র ট্রাফিক (উত্তর) বিভাগের ইন্সপেক্টর (এডমিন) মহিউদ্দিন খান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, রাস্তায় যাত্রী কমেছে। পাল্লা দিয়ে কমেছে যানবাহন। গাড়ির স্বল্পতার কারণে যানজট নেই। অনেকে করোনাভাইরাসের ঝুঁকি থেকে বাঁচতেও গণপরিবহন এড়িয়ে সড়কে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছে। কিন্তু ঝুঁকি থাকলেও সতর্কতার সাথে আগের মতই ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এমএফও

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন