s alam cement
আক্রান্ত
৫৪৮০৭
সুস্থ
৪৬১৯১
মৃত্যু
৬৪২

করোনায় ছারখার হোটেল জামান পরিবার— ২ মাসে ৩ মৃত্যু, ৮ মাসে ৪

1

দুই মাস আগে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের কাছে আক্ষেপ করে তিনি বলেছিলেন, ‘এই ভাইরাস আমাদের জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছে।’ বাবা মারা গিয়েছিলেন করোনায়, তার মাত্র দুই মাসের মাথায় সেই করোনাতেই মারা গেলেন তিনি নিজেও। এর আগে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে জামান পরিবারের আরও দুই সদস্য মারা যান। এর মধ্যে মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নেন সহোদর তিন ভাই— এর মধ্যে দুই ভাই মাত্র একদিনের ব্যবধানে।

এমন ট্রাজিক মুহূর্ত অপেক্ষা করছিল যাদের জন্য, সেই চারজনের হাতেই তিল তিল শ্রমে গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের নামি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্যাফে জামান বা হোটেল জামান। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি প্রথমে মারা যান মেজ ভাই মোহাম্মদ জামান। ক্যান্সারে এই ভাইটি মারা যাওয়ার পর জামান পরিবারে এলো করোনার থাবা। করোনার কাছে হেরে মাত্র একদিনের ব্যবধানে মারা গেলেন বাকি দুই ভাই— ২১ জুন প্রথমে ছোট ভাই নুরুজ্জামান এবং ২৩ জুন বড় ভাই মালেকুজ্জামান। সবশেষ গত শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় মালেকুজ্জামানের ছেলে সেলিম জামান মারা গেলেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও থাইরয়েডের রোগেও ভুগছিলেন। চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ের ইফকো কমপ্লেক্সের জামান হোটেল থেকে চট্টগ্রামের সব শাখা সেলিম জামানই পরিচালনা করে আসছিলেন।

প্রথমে ক্যান্সার এবং পরে করোনাভাইরাস এসে জামান পরিবারে গৌরবময় একটি অধ্যায় এভাবেই শেষ করে দিল। চলতি বছরের শুরুতেই যেন জামান পরিবারে মৃত্যুর মড়ক লেগে যায়। একের পর এক দুঃসংবাদ পরিবারটির পিছু লেগেই থাকে যেন।

চলতি ২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর আল ফালাহ গলির নিজ বাসভবনে মারা যান মেজ ভাই মোহাম্মদ জামান। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হোটেল জামান অ্যান্ড বিরানী হাউসের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দুই ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে গেছেন তিনি।

জামান পরিবারে এরপর এলো করোনার থাবা। টানা ১৭ দিন করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়ে গত ২১ জুন ঢাকা আজগর আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ক্যাফে জামানের মালিক নুরুজ্জামান (৬৫)। তিনি ছিলেন ভাইদের মধ্যে সবার ছোট।

অন্যদিকে এর মাত্র মাত্র একদিন পর ২৩ জুন চট্টগ্রামের সার্জিস্কোপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৫ বছর বয়সে মারা যান হোটেল জামানের আরেক মালিক মালেকুজ্জামান। পরিবারে তিনি ছিলেন সবার বড়।

Din Mohammed Convention Hall

সবশেষ সেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েই শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় মালেকুজ্জামানের ছেলে সেলিম জামান মারা গেলেন।

এমন একটি পরিবারে কিভাবে ঢুকলো করোনার বিষ, যার কবলে পড়ে পরিবারের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হল— এ প্রশ্ন বাইরে যেমন, পরিবারের ভেতরেও সবাইকে ভাবাচ্ছে।

গত জুনের শেষ সপ্তাহে চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল সদ্য মারা যাওয়া সেলিম জামানের। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘বাবা (মালেকুজ্জামান) নিয়মিত বাজার করতে যেতেন। মসজিদেও যাওয়া-আসা ছিল তার। এই দুই জায়গা থেকে আমাদের ঘরে করোনা ঢুকে থাকতে পারে।’

সেলিম জামান বলেছিলেন, ‘বাবার একটু জ্বর হয়েছিল রমজানের শেষের দিকে। একসময় জ্বর কমেও যায়। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হচ্ছিলেন না তিনি। ঈদের পর করোনা পরীক্ষা করিয়ে দেখি পজিটিভ এসেছে। তখন নগরীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখান থেকে একটু সুস্থ হওয়ার পর তাকে বাসায় নিয়ে আসি। কিছুদিন পর হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তার। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে তাকে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ থাকার পর অবস্থা যখন আরও অবনতি হতে থাকে, তখন আইসিইউ সাপোর্ট নিয়ে বাবাকে সার্জিস্কোপে ভর্তি করাই। ওখানে ৬ দিন থাকার পর আবার বাসায় নিয়ে আসি।’

তিনি বলেন, ‘সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। বাবাকে সুস্থ মনে করে আমরাও বাসায় আনতে দ্বিধা করিনি। কিন্তু ২৩ জুন আবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয় বাবার। তখন তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু তখন আর আমরা আইসিইউ পেলাম না। ফলে বাবাকে আর রাখতে পারলাম না। সেদিনই মারা গেলেন তিনি।’

হোটেল জামানের আরেক কর্ণধার লালখানবাজার বাঘঘোনার বাসিন্দা নুরুজ্জামানের ছেলে সাহেদ জামান বলেন, ‘ঈদের দিন বাসার পাশে একজন করোনা রোগী মারা যান। তার জানাজায় গিয়েছিলেন বাবা। আমাদের ধারণা, সেখান থেকেই আমাদের বাসায় হানা দিয়েছে করোনা। এখন আমার ছোট ভাই সাজিদ জামান ছাড়া আমরা সব ভাইবোন করোনা পজিটিভ।’

তিনি বলেন, ‘বাবা যদি ওই করোনা রোগীর জানাজায় না যেতেন তাহলে হয়তো আমরা বেঁচে যেতাম। বাবাও জানতেন না ওই লোক করোনা আক্রান্ত ছিলেন। জানাজা শেষে দাফনের পর জানতে পারেন ওই লোক করোনা পজিটিভ ছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। বাবার পরপর আমরাও করোনায় আক্রান্ত হই।’

চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ খুলশী মুরগির ফার্ম এলাকায় জামান ভবনে বসবাস করে পরিবারের বড় সন্তান মালেকুজ্জামানের পরিবার। মালেকুজ্জামানের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে। এরা হলেন সেকান্দর জামান, সেলিম জামান, আলমগীর জামান, খোকন জামান, মামুন জামান এবং মেয়ে বেবী জামান। এর মধ্যে সেলিম জামান মারা গেলেন।

মেজ ভাই মোহাম্মদ জামানের পরিবারের বসবাস নগরীর আল ফালাহ গলির জামান ভবনে। তার দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। এরা হলেন কায়সার জামান, ছোটন জামান, মেয়ে রোখসানা পারভীন, সাবিনা ইয়াসমিন ও রেহেনা পারভীন মুন্নি।

অন্যদিকে ছোট ভাই নুরুজ্জামান লালখানবাজার বাঘঘোনার জামান ভবনের বাসিন্দা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। তারা হচ্ছেন সাকিলা জামান রুবী, সালমা জামান রুণী, সাহেদ জামান ও সাজিদ জামান। তারা বসবাস করেন।

মৃত্যুর পর দুই ভাইকে গ্রামের বাড়ি রাউজানের কোতোয়ালী ঘোনার কাসেম ফকির বাড়ির একই কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে জানুয়ারিতে মৃত্যুবরণ করা মেজ ভাইকে দাফন করা হয়েছিল চট্টগ্রাম নগরীর চশমা হিল কবরস্থানে। সবশেষ শনিবার (২৯ আগস্ট) রাতে সেলিম জামানকেও দাফন করা হল রাউজানের কোতোয়ালী ঘোনার পারিবারিক কবরস্থানে।

সিপি

ManaratResponsive

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

1 মন্তব্য
  1. সুমন বলেছেন

    দক্ষিন হবে না পশ্চিম খুলসী। সামান্য এই তথ্য ভূল না হলেই কি নয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm