আক্রান্ত
১৮২৪৪
সুস্থ
১৪৩৬১
মৃত্যু
২৮৪

সামনে এবং পেছনে/ করোনাভাইরাসের ৬ মাসে ৪ সংকটে বাংলাদেশ

0

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে গত ছয় মাসের লড়াই থেকে শেখার আছে অনেক কিছুই। তবে ছয় মাসের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা যে বিষয়টি আগে শিখেছি তা হল, রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল অংশ সঠিক শিক্ষাটি নিতে প্রস্তুত নয়।

করোনাভাইরাসের কারণে চারটি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ।

প্রথমত, স্বাস্থ্য সংকট। করোনাভাইরাস বাংলাদেশে সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশার উন্মোচন করে দিয়েছে। তবুও এই খাতকে পুনর্গঠনে সরকারকে ততোটা উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। মহামারির কারণে শুরুর দিকে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল তা অনেকটাই কেটে গেলেও, অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। এর মধ্যেই মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে তিনটি মনোভাবের। প্রথমটি হলো— ঘরে বসে থাকার আর কোনো সুযোগ নেই, দ্বিতীয়টি হলো— কোভিড টেস্টের প্রাধান্যও আর নেই এবং তৃতীয়টি হলো— হাসপাতাল এবং ক্লিনিক এড়িয়ে চলা কারণ এগুলোতে ভোগান্তি এবং খরচ দুটোই বেশি।

দ্বিতীয় যে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ তা হলো অর্থনৈতিক সংকট। ছয় মাস পর এসেও বর্তমানে এই রেকর্ড একটা মিশ্র অবস্থার মধ্যে আছে। ঝুঁকিপূর্ণ দুটি খাত পরিলক্ষিত হয়েছে। এরমধ্যে তৈরি পোশাক খাতটি ঘুরে দাঁড়ালেও চাল উৎপাদন কমেছে। উদ্যোক্তা এবং কৃষকরা তাদের ভূমিকা পালন করছেন। তৈরি পোশাক খাতে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজও কাজে দিয়েছে। কিন্তু কৃষক, ক্ষুদ্র ও কুটির ও মাঝারি শিল্প এবং স্বল্প আয়ের লোকজনের জন্য দেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজ অনেকটা কাগজে-কলমেই ছিল। অর্থনীতিকে সামাল দিতে যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছিল তার সবকটি ঠিকভাবে কাজ করেনি। মহামারির কারণে আগের ২০ দশমিক ৫ শতাংশ গরীবের সঙ্গে আরও ২১ দশমিক ৭ শতাংশ গরীব যোগ হয়েছে। উপার্জন কমে যাওয়াও সংসার চালাতে হিমশিমের মধ্যেই ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে ১৬ শতাংশ দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ।

তৃতীয়ত হল, হিউম্যান ক্যাপিটাল ক্রাইসিস। স্কুল বন্ধ থাকায় শুধুমাত্র শিক্ষার্থীরাই যে সংকটে আছে তা কিন্তু নয়। পুরো প্রজন্মই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাদের ভবিষ্যত, সামাজিক এবং নীতিগত বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগের অভাবও রয়েছে।

চতুর্থত হল, শাসনব্যবস্থার সংকট। এটা দুইভাবে হয়েছে। মহামারিকালে স্বাস্থ্য খাতকে জর্জরিত করে নির্লজ্জ দুর্নীতি এবং ত্রাণের চাল ও টাকা নিয়ে দুর্নীতি সামনে চলে এসেছে। এইসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে জনমানুষের দাবিকে উপেক্ষা করার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার সংকট সামনে নিয়ে এসেছে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ এমন এক শাসনব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে যেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো লোকজনের অ-কর্মক্ষমতারও তেমন কোনো রাজনৈতিক দায় থাকছে না।

এই চারটি সংকট ছাড়াও গত ছয় মাস ধরে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় খেয়াল করা যায়। আর তা হলো, জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের লড়াকু মনোভাবে ফিরে আসা। মহামারির মধ্যেও বোরো চাষের জন্য কাজ করে গেছেন কৃষকরা, করোনার ঝুঁকি উপেক্ষা করেও কারখানায় ফিরেছেন শ্রমিকরা।

ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গত জুন মাসে পিপিআরসি এবং বিআইডিজি একটি জরিপ করে যাতে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই অদূর ভবিষ্যতে অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং হতাশার কথা জানিয়েছেন। তবে এটি কেবল নতুন নীতিমালার জন্য নয়, আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে এটি নতুন জাতীয় মেজাজের জন্য প্রয়োজন। সরকার কি এই প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারবে?

কোভিড -১৯ বাংলাদেশকে একটি নতুন নীতিগত এজেন্ডা নিতে বাধ্য করেছে। পরবর্তী ছয় মাসের দিকে এই চারটি বিষয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে নজর দিতে হবে:

  • নতুন করে গরীব হয়ে যাওয়া বিশেষ করে শহরের অনানুষ্ঠানিক পেশার লোকজনের ওপর খেয়াল রাখতে হবে।
  • গ্রামীণ পুনজাগরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন খাতের জন্য বড় রকমের প্রণোদনা প্যাকেজের ভিত্তিতি এজেন্ডা নির্ধারণ করতে হবে।
  • হিউম্যান ক্যাপিটাল ক্রাইসিসকে উপস্থাপন করতে জরুরিভিত্তিতে একটি জাতীয় অধিবেশনের আয়োজন করতে হবে।
  • স্বাস্থ্য খাতকে পুনর্গঠন করতে একটি একটি কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

অগ্রাধিকারভিত্তিতে করা এই কাজগুলো শুধুমাত্র সরকারের জন্যই না। নাগরিক সমাজের ভূমিকাও সঙ্কুচিত হয়ে আছে। এই কাজগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য নাগরিকদেরকেও তাই যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক: এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ManaratResponsive

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন
ksrm