কক্সবাজার-ঢাকা পর্যটক ট্রেনে ১৩ দিনে ৬ বার পাথর হামলা, রামু থেকে ঈদগাঁ ঝুঁকিপূর্ণ বেশি

রাতে আবার শিশুর মুখে আঘাত

কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী পর্যটক ট্রেনে একের পর এক পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যাত্রীদের মধ্যে। চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনে ছয়বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে চার দিনের ব্যবধানে তিনজন আহত হয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটলো আজ শনিবার (১৪ মার্চ) রাত সোয়া আটটায়। রামু স্টেশন থেকে পর্যটক এক্সপ্রেস যখন ঈদগাঁ অভিমুখে চলছিল, বাইরে থেকে সজোরে ছুটে আসা একটি পাথর সরাসরি আঘাত হানলো ১১ বছর বয়সী শিশু অর্ণন চৌধুরীর মুখে। আঘাতের অবস্থাও গুরুতর। ওই জায়গায় আজ দিনের বেলায়ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালায় রেল পুলিশ ও রেল কর্তৃপক্ষ।

এর আগে গত রোববার (৯ মার্চ) রাত সাড়ে ৯টার দিকে সাতকানিয়া ও ডুলাহাজরার মধ্যবর্তী এলাকায় পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। গত এক বছরে একই রুটে ৪০টিরও বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে, যাতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

কক্সবাজার-ঢাকা পর্যটক ট্রেনে ১৩ দিনে ৬ বার পাথর হামলা, রামু থেকে ঈদগাঁ ঝুঁকিপূর্ণ বেশি 1

রেলওয়ে রেঞ্জ পুলিশের জিআরপি সূত্র জানায়, পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঠেকাতে গত ৫ মার্চ থেকে সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করা হয়। মাইকিং করা হয় এবং মসজিদের জামাতে এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এসব কার্যক্রম চলমান থাকার মধ্যেই আবার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটায় জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে রামু থেকে ঈদগা রেলস্টেশনের মধ্যবর্তী তিনটি কালভার্টকে অপরাধ সংঘটনের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে রামু থেকে ঈদগা রেলস্টেশনের মধ্যবর্তী তিনটি কালভার্টকে অপরাধ সংঘটনের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকামুখী পর্যটক ট্রেনে কক্সবাজারের রামু ও ঈদগা স্টেশনের মধ্যবর্তী জোয়ারিয়া নালা এলাকায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় দুই যাত্রী আহত হন। এতে ট্রেনের ৮ থেকে ১০টি জানালার কাচ ভেঙে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই রাতে হঠাৎ করে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল একযোগে পাথর নিক্ষেপ শুরু করলে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে সুফল বিশ্বাস (২৪) গুরুতরসহ দুইজন আহত হন।

পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঠেকাতে গত ৫ মার্চ থেকে সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করা হয়।
পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঠেকাতে গত ৫ মার্চ থেকে সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করা হয়।

এর আগের দিন সোমবার (২ মার্চ) রাত ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা স্টেশনের কাছে ঢাকাগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে রেলের বেডিং পোর্টার পদে কর্মরত ছাবের আহমদ (৫২) গুরুতর আহত হন। সহকর্মীরা তাকে প্রথমে মালুমঘাট খ্রিস্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তার মাথায় ১০টি সেলাই দেওয়া হয়।

তবে ২ ও ৩ মার্চের এসব ঘটনায় এখনো কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জ জিআরপির সেকেন্ড অফিসার এসআই সহদেব।

ডাকাতি চেষ্টার সন্দেহ

৩ মার্চের ঘটনায় অনেক যাত্রী এটিকে ডাকাতির চেষ্টা বলে মনে করছেন। স্থানীয় ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন সন্দেহের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। জানা যায়, কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা পর্যটন এক্সপ্রেস ট্রেনটি ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে রামু ও ইসলামাবাদ স্টেশনের মধ্যবর্তী জোয়ারি পাড়া এলাকায় চারপাশের বিল, জমি ও বনের আড়াল থেকে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল বৃষ্টির মতো পাথর নিক্ষেপ শুরু করে।

অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ছিদ্দিকুর রহমান (৬৫) বলেন, নির্জন এলাকায় ব্রিজের আশপাশ থেকে এভাবে পাথর নিক্ষেপ সাধারণত ডাকাতির উদ্দেশ্যে দলবদ্ধভাবে করা হয়—অভিজ্ঞতা থেকে তার এমন ধারণা। একই মন্তব্য করেছেন ওই ট্রেনের যাত্রী জেবুন্নাহার। হালিশহরের এই গৃহিণীর মতে, ঘটনাটি ডাকাতির চেষ্টা হতে পারে।

তবে ট্রেনের চালক শামীম তালুকদার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি শুধু জানান, জায়গাটি নিরিবিলি ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় তিনি প্রায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালিয়ে এলাকা পার হন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কালভার্ট চিহ্নিত

সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে রামু থেকে ঈদগা রেলস্টেশনের মধ্যবর্তী তিনটি কালভার্টকে অপরাধ সংঘটনের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ওই কালভার্টগুলো ঘিরে চারপাশে বিল, বন ও জনমানবশূন্য পরিবেশ থাকায় দুর্বৃত্তরা অপরাধ সংঘটনের জন্য এগুলো ব্যবহার করে। ৩ মার্চের ঘটনায় একটি কালভার্টের নিচ থেকে পাথর নিক্ষেপে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

কক্সবাজার রুটে সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে চকরিয়া ও রামু উপজেলায়।

মামলা নেই, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

চলতি মাসের প্রথম চার দিনে একই ট্রেনে টানা পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় তিনজন আহত হলেও রেল কর্তৃপক্ষ বা যাত্রীদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। এতে যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আহতের ঘটনার বিষয়ে জানতে বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা তৌশিয়া আহম্মেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিভাগীয় রেল ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া জানান, আহত হওয়ার ঘটনার পর বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দায়িত্বে কোনো গাফিলতি আছে কি না, তা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এদিকে আজ শনিবারের (১৪ মার্চ) ঘটনার পর কেউ কেউ মনে করছেন, ঈদকে সামনে রেখে সড়ক পরিবহনে যাত্রী বাড়ানোর জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। ট্রেন চলাচলের কারণে বাস মালিকদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ভয় তৈরি করতে চক্রান্ত থাকতে পারে—এমন ধারণাও করছেন অনেকে। তবে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব কার—পুলিশ নাকি রেল কর্তৃপক্ষ—সে প্রশ্নও উঠেছে।

একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন, পুলিশ নিজ উদ্যোগে বাদী হয়ে মামলা করতে পারত। কিন্তু বড় দুটি ঘটনায় কেন মামলা হয়নি, তা স্পষ্ট নয়।

চট্টগ্রাম জিআরপি থানার ওসি রফিকুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানানো হয়। রেলওয়ে জিআরপি পুলিশের পুলিশ সুপার তহুরা জান্নাতকে ফোন ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

রামু জিআরপি সূত্র জানায়, পুলিশ সুপারের নির্দেশে ৫ মার্চ থেকে রামু স্টেশন এলাকায় মাইকিং, মসজিদে প্রচারসহ জনসচেতনতা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রাম জিআরপির সহকারী পুলিশ সুপার রিজওয়ান সাঈদ জিকু বলেন, রামু থেকে ঈদগা পর্যন্ত রেলপথের চারপাশে বিল, বন ও পাহাড় থাকায় মানুষের বসতি খুব কম। তাই ওই এলাকায় দুটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের কাজ চূড়ান্ত হয়েছে। ৫ মার্চ থেকে রামু স্টেশন এলাকা ও মসজিদে পুলিশ সুপারের নির্দেশে জনসচেতনতা কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।

সিপি

ksrm