এস আলম-জাবেদসহ ১১ গ্রুপের পাচার করা টাকা খুঁজছে সরকার, সংসদে তারেক রহমান

অনুসন্ধান চলছে ১০ দেশে, ৭০ হাজার কোটির সম্পদ ক্রোক

বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরাতে একযোগে আইনি লড়াইয়ে নেমেছে সরকার। এস আলম গ্রুপ ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ আন্তসংস্থা টাস্কফোর্সের চিহ্নিত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় ইতিমধ্যে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারসহ ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্টদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্য ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও হংকং-চায়নাসহ মোট ১০টি দেশে পাচার হওয়া অর্থের খোঁজ চলছে।

এস আলম-জাবেদসহ ১১ গ্রুপের পাচার করা টাকা খুঁজছে সরকার, সংসদে তারেক রহমান 1

বুধবার (১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে আলাদা দুটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং ও আর্থিক অপরাধ দমনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে আধা ঘণ্টা প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরের জন্য নির্ধারিত ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বুধবার (১ এপ্রিল) প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত এই প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলার আওতায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এস আলম গ্রুপ ও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পাশাপাশি বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল, সামিট গ্রুপ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে’ সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে।

অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিসংখ্যান

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বাইরে গেছে। প্রতিবছর গড়ে এই পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার সমান।

তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরের অভিযোগ থাকায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। এ জন্য ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ (এমএএলটি) সম্পাদন ও বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত গন্তব্য দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চায়না রয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মতি দিয়েছে। বাকি সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

তদন্ত ও মামলার অগ্রগতি

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ দল গঠন করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আদালত ২৫ মার্চ ’২৬ পর্যন্ত ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছে। এর মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে এখন পর্যন্ত ১৪১টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টির অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় হয়েছে।

সম্পূরক প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আইন মেনে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অতীতে আইন ও নীতিনৈতিকতা উপেক্ষা করে বিভিন্নভাবে সম্পদ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সংসদ নেতা বলেন, কেউ যেন ন্যায্য আইন থেকে বঞ্চিত না হয়, সে লক্ষ্যে সব প্রক্রিয়া আইনের মধ্যেই সম্পন্ন করা হবে। যারা দেশের অর্থ পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই অর্থ জনগণের। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাই এই অর্থ ফিরিয়ে এনে দেশ ও জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। জনগণের অর্থ ফেরাতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

ksrm