এসিডের ক্ষত নিয়ে পাষণ্ড স্বামীর খোঁজে আদালতপাড়ায় ঘোরেন অসহায় গৃহবধূ (ভিডিও)

আদালতে হয়েছিল বিয়ে, এরপর প্রতিদিনই চলে অকথ্য নির্যাতন

আদালতের নির্দেশে গত চার মাস আগে সাগরের সঙ্গে বিয়ে হয় ফারহানা ইসলাম শারমিনের। কিন্তু জামিনের পর মাস না পেরোতেই আবারও সেই পুরনো রূপে ফিরে যান সাগর। আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যৌতুকের দবিতে স্ত্রীকে বেধড়ক পিটিয়ে তিনি পালিয়েছেন সংসার ছেড়ে। এমনকি সাগরের পরিবারও তাকে মারধর এবং এসিডও নিক্ষেপ করে। স্বামীর খোঁজ নিতে গিয়ে পদে পদে অপমান ও লাঞ্ছিত শারমিনের ঠিকানা হয়েছে হাসপাতালের বেডে। তারপরও জীবনের কাছে হার মানেননি এই নারী। স্বামীকে ফিরে পেতে এসিডের ক্ষত নিয়ে আবারও হন্যে হয়ে ঘুরছেন আদালতপাড়ায়।

বুধবার (৪ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম আদালতপাড়ায় সরেজমিনে দেখা গেছে, গত চার মাস আগে আদালতপাড়ায় আসা শারমিনকে দেখে চিনতে কারও ভুল করার কথা নয়। কোলে তার ২০ মাস বয়সী কন্যা সন্তান। শীতের দিনে শিশুটির গায়ে রয়েছে শুধুমাত্র একটি পাতলা জামা। মায়ের যন্ত্রণা সয়ে সেও যেন কোনো রকমে মানিয়ে নিয়েছে।

জানা গেছে, চাকরিসূত্রে পরিচয়ের একপর্যায়ে প্রেমের সম্পর্ক হয় সাগর-শারমিনের। স্বামী-স্ত্রী হিসেবে এক ঘরে বসবাস শুরু করেন তারা। ঢাকা, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘর ভাড়া করে ছিলেন। কিন্তু তারা কাগজে-কলমে বিয়ে করেননি। এর মধ্যে তাদের ঘরে আসে এক কন্যাশিশু। শিশু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শারমিন বিয়ের কথা বললে তাতে অস্বীকৃতি জানায় সাগর। শুধু তাই নয়, নির্মম অত্যাচারও সহ্য করতে হয় শারমিনকে।

পরে গত বছরের ১৮ জুলাই আদালতে গিয়ে সাগরের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা ঠুকে দেন শারমিন। মামলায় পুলিশ সাগরকে গ্রেপ্তার করে। সেই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে হাজতবাস করছিলেন সাগর। জামিন আবেদন করলে আদালত থেকে ফের বিয়ের প্রসঙ্গ তোলা হয়। একপর্যায়ে তার পক্ষে আদালতে আইনজীবী জামিন আবেদন করেন। জামিন শুনানিতে বিয়ের প্রসঙ্গ উঠে আসে। সাগরের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি বিয়ে করতে রাজি কি-না। তিনি এতে সম্মতি দেন। এরই ধারাবাহিকতায় জামিনের শর্তে শারমিনকে স্ত্রী হিসেবে বরণ করে নেন সাগর।

গত বছরের ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ আজিজ আহাম্মদ ভূঁইয়ার আদালতে তাদের বিয়ের আয়োজন করা হয়। সাড়ে চার লাখ টাকার কাবিনে সাগর-শারমিনের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

Yakub Group

আদালতের নির্দেশে সাড়ে চার লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় শারমিনের। কিন্তু এরপরও তিনি কেন আজ আদালতে—জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন শারমিন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে বিয়ের পর জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আনুসাঙ্গিক কাগজপত্র ঠিকঠাক করতে বরিশালে নিজ বাড়িতে যান সাগর। প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন পরে ফিরে এসে আমার সঙ্গেই সংসার করছিলেন। নতুন সংসারে চার থেকে পাঁচদিনের মাথায় আবারও আমাকে যৌতুকের দাবিতে মারধর শুরু করেন তিনি। আমার মা-বাবা না থাকায় মামার কাছ থেকে টাকা এনে দিতে বলেন। কিন্তু এতে আমি অপারগতা জানালে তিনি ঘর থেকে পালিয়ে তার মা-বাবার কাছে চলে যান।’

তিনি বলেন, ‘গত ১৫ সেপ্টেম্বর তাকে খুঁজতে গেলে তার ভাই রেজাউল করিম শাকিল, মা মোরশেদা বেগম ও বাবা মো. ইদ্রিসসহ মিলে আমাকে বেধড়ক মারধর করেন। মারধরের একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে, পাশের বাসার এক হিন্দু মহিলা আমাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন। সেখানে ১৫ দিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয় আমি।’

শারমিন বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আবারো সাগরের খোঁজে তার মা-বাবার বাসায় গেলে আবারও আমাকে মারধর ও এসিড নিক্ষেপ করেন তারা। সাগরের মা আমাকে এসিড নিক্ষেপ করেন। আমি মুখে ওড়না দেওয়ায় এসিড আমার মাথায় পড়ে, মুখেও কয়েক ফোটা পড়েছে। এই সময় সাগরের ভাই রেজাউল করিম শাকিল পাটার বাটনি দিয়ে আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। তাদের বেধড়ক মারধরে আমি আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে মারধরের সময় রেজাউল করিম শাকিল বলেন, মামলা চালাতে টাকার প্রয়োজন হয়। তোর কাছে সেই টাকাও নেই, আমার কাছে টাকা আছে। টাকা দিয়ে আমি আইন কিনে নেব। তারপরও তোকে আমার ভাইয়ের বউ হিসেবে মেনে নেব না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোকে মেরেই ফেলবো। এদিকে জ্ঞানহারা থাকার কারণে আমাকে কে বা কারা হাসপাতালে রেখে এসেছে, আমার জানা নেই। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমি আবারো চট্টগ্রাম মেডিকেলে। সেখানে প্রায় এক মাস চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়েছি। তবে ডাক্তার বলেছে, আমার মাথায় এসিডের ক্ষততে পোকা চলে এসেছে। অতি দ্রুত অপারেশনের মাধ্যমে ক্ষত সারাতে হবে। অন্যথায় ছয় মাসের মধ্যে এই যন্ত্রণার কারণে আমার মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান ডাক্তার।’

পাঁচ মাসের ঘর ভাড়া বকেয়া থাকায় গত মঙ্গলবার (৩ জানুয়ারি) বাড়িওয়ালা ঘর থেকে বের করে দেয় শারমিনকে। ওইদিন তিনি রাত কাটিয়েছেন বায়েজিদ থানার বারান্দায়। কান্নারত এই নারী বলেন, ‘আমার বাচ্চাটাকে কোথাও দত্তক দিতে পারলে আমি আত্মহত্যা করে মরে যেতাম। আমার মৃত্যুর সংবাদ পেলে আমার সন্তানকে কোনো অনাথ আশ্রমে দিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আপনারা (সাংবাদিক) নেবেন। কারণ আমার সংগ্রাম থেকে শুরু করে আদালতে বিয়ে পর্যন্ত গড়ানো, সবকিছুতে আপনাদের সহায়তা পেয়েছি।’

শারমিন বলেন, ‘এবার সাগর ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিগ্যাল এইডে গিয়েছি। সেখান থেকে আহমেদ কবির নামের এক আইনজীবীর আমার সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আমার পূর্বের মামলার সকল নথি সেই আইনজীবীকে দিয়ে এসেছি।’

ডিজে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ksrm