এবারও চট্টগ্রাম ওয়াসায় ৭৮ কোটি টাকার পানির বিল হবে না, দুই বছরে হাওয়া ১৬৭ কোটি

প্রতিদিন বিল ছাড়াই ‘উধাও’ হচ্ছে ১১ কোটি লিটার পানি

একদিকে শত শত কোটি টাকার পানি উৎপাদন, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার সেই পানির কোনো বিলই উঠছে না। টানা দুই অর্থবছরে এভাবে ১৬৭ কোটি ৩৮ লাখ ২০ হাজার টাকা রাজস্ব হারানোর পরও চট্টগ্রাম ওয়াসা এবার সিস্টেম লস কমানোর লক্ষ্য নেয়নি; বরং ২২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ শুরুতেই প্রায় ৭৮ কোটি টাকার পানি বিলের বাইরে থাকবে ধরে বাজেট করেছে সংস্থাটি। ওয়াসার ভাষ্য, পাইপলাইনের লিকেজ ও অবৈধ সংযোগের কারণে এ ক্ষতি বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, বছরের পর বছর একই অজুহাতের পরও সিস্টেম লস কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?

সাধারণ গ্রাহকদের সামান্য পানির বকেয়া বিল পরিশোধের তাগিদ দিতে চট্টগ্রাম ওয়াসা মাইকিং করছে দিনরাত। অথচ সিস্টেম লসের নাম দিয়ে দুই বছরে হাওয়া হয়ে গেছে ১৬৭ কোটি টাকার পানি। প্রতিদিন বিল ছাড়াই ‘উধাও’ হচ্ছে ১১ কোটি লিটার পানি।
সাধারণ গ্রাহকদের সামান্য পানির বকেয়া বিল পরিশোধের তাগিদ দিতে চট্টগ্রাম ওয়াসা মাইকিং করছে দিনরাত। অথচ সিস্টেম লসের নাম দিয়ে দুই বছরে হাওয়া হয়ে গেছে ১৬৭ কোটি টাকার পানি। প্রতিদিন বিল ছাড়াই ‘উধাও’ হচ্ছে ১১ কোটি লিটার পানি।

শুভঙ্করের হিসাব

চট্টগ্রাম ওয়াসার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এ অর্থবছরে সংস্থাটির ছয়টি পানি শোধনাগার থেকে ২ লাখ ৭৫০ মেগালিটার পানি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ১ মেগালিটার সমান ১০ লাখ লিটার পানির হিসেবে সেই পানির পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ হাজার ৭৫ কোটি লিটার। একই পরিমাণ পানি বিতরণ করা হলেও এর মধ্যে বিল করা হবে ১ লাখ ৬০ হাজার ৬০ মেগালিটারের। বাকি ৪০ হাজার ১৫ মেগালিটার বা ৪ হাজার ১৫ কোটি লিটার পানি নন-রেভিনিউ ওয়াটার বা সিস্টেম লস হিসেবে ধরা হয়েছে।

এবারও চট্টগ্রাম ওয়াসায় ৭৮ কোটি টাকার পানির বিল হবে না, দুই বছরে হাওয়া ১৬৭ কোটি 1

চট্টগ্রাম ওয়াসা আবাসিক গ্রাহকের কাছে প্রতি ঘনমিটার (এক হাজার লিটার) পানি ১৮ টাকায় এবং অনাবাসিক গ্রাহকের কাছে ৩৭ টাকায় বিক্রি করে। মোট সরবরাহের ৯৩ শতাংশ যায় আবাসিক এবং ৭ শতাংশ অনাবাসিক গ্রাহকের কাছে। এই হিসাবে আবাসিক খাতে বিল না হওয়া পানির আর্থিক মূল্য ৬৭ কোটি ২১ লাখ ১১ হাজার টাকা এবং অনাবাসিক খাতে ১০ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে সিস্টেম লসের আর্থিক মূল্য দাঁড়াবে ৭৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকা।

দুই বছরে রাজস্ব হারিয়েছে ১৬৭ কোটি টাকা

ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৭৫০ মেগালিটার পানি উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে বিল করা হয়েছিল ১ লাখ ৫২ হাজার ৫৭০ মেগালিটারের। বিলের বাইরে থেকে যায় ৪৮ হাজার ১৮০ মেগালিটার বা ৪ হাজার ৮১৮ কোটি লিটার পানি। আবাসিকের হিসাবে এর আর্থিক মূল্য ছিল ৮৬ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৭১ হাজার ৯৬০ মেগালিটার পানি উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে বিল করা হয়েছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ১৫০ মেগালিটারের। বিল না হওয়া পানির পরিমাণ ছিল ৪৪ হাজার ৮১০ মেগালিটার। আবাসিকের হিসাবে এর আর্থিক মূল্য ছিল ৮০ কোটি ৫৬ লাখ ২৬ হাজার টাকা।

দুই অর্থবছর মিলিয়ে বিল না হওয়া পানির কারণে ওয়াসার রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬৭ কোটি ২৮ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।

বাজেটেই স্বীকারোক্তি, বাড়ছে সিস্টেম লস

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন প্রকল্পগুলোতে পানির চাপ বেশি থাকায় পাইপলাইনে লিকেজ বেড়েছে। এ কারণে নন-রেভিনিউ ওয়াটারের হার ২২ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ হার কমাতে টেলিমিটারিং পদ্ধতিসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, রাজস্ব বহির্ভূত পানির পরিমাণ কমাতে সরবরাহ নেটওয়ার্ককে ডিএমএতে বিভক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কেপিআইগুলোকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।

সংযোগ বেড়েছে, মিটারের বাইরে এখনও ১০১ লাইন

চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির মোট পাইপলাইন ৯৬২ কিলোমিটার। চলতি অর্থবছরে পারিবারিক সংযোগ রয়েছে ৯২ হাজার ২৭২টি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৯২ হাজার ১১২টি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৯২ হাজার ২০০টি।

চট্টগ্রাম ওয়াসায় পানির মোট লাইন ৯৬২ কিলোমিটার। পানির সংযোগ পারিবারিক ৯২ হাজার ২৭২টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৯২ হাজার ১১২টি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এটি ছিল ৯২ হাজার ২০০টি।

চলতি অর্থবছরে বাণিজ্যিক সংযোগ বেড়ে হয়েছে ৯ হাজার ২১০টি। আগের অর্থবছরে ছিল ৯ হাজার ১১০টি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৬ হাজার ৯২০টি। মিটারের বাইরে থাকা পানির সংযোগ রয়েছে ১০১টি।

চুরি, অবৈধ সংযোগ ও লিকেজের দায়

ওয়াসার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পানির চুরি, অবৈধ সংযোগ, মিটার পরিদর্শকদের কারসাজি, পাইপলাইনের ছিদ্র এবং রাস্তার কল থেকে পানির অপচয়ের কারণে সিস্টেম লস বেশি হচ্ছে। এ হার কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

পানি অপচয়ের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান মুহম্মদ রশিদুল হাসান বলেন, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়াই নতুন পাইপলাইন বসানোর কারণে আবারও লিকেজ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, অতীতে ওয়াসার প্রতিটি বোর্ড সিস্টেম লস কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম ফজলুল্লাহর সময়ে এ বিষয়ে কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত করতেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, প্রতিটি সভায় সিস্টেম লস কমানোর বিষয়টি আলোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের পানির চুরি কমাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাইপলাইনের ত্রুটির কারণে সিস্টেম লস কমিয়ে আনা যাচ্ছে না।

ডিজে/সিপি

ksrm