আক্রান্ত
১৮৬৯৫
সুস্থ
১৫০৬২
মৃত্যু
২৯০

এক রোগীতে সোয়া ২ লাখ টাকা ‘খরচ’ দেখালো চসিকের আইসোলেশন সেন্টার

কয়েক কোটি টাকা ‘লুটপাট’ করোনাকালেই

0

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আইসোলেশন সেন্টারে সাধারণ উপসর্গ নিয়ে আসা একেকজন করোনারোগীর পেছনে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা করে। অথচ তুলনামূলক জটিল করোনা রোগী সামাল দিয়েও ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা আরেক আইসোলেশন সেন্টারে একেকজন করোনারোগীর পেছনে খরচ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ১৭৮ টাকা!

করোনা চিকিৎসার নাম দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে (চসিক) এমন পুকুরচুরির ঘটনা যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে। তবে বিষয়টি হজম করতে পারেননি চসিকে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও। চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন এরই মধ্যে ঘটনা তদন্তে গঠন করেছেন তিন সদস্যের কমিটি। ওই কমিটি ইতিমধ্যে আইসোলেশন সেন্টারের ব্যয়ে গরমিল শনাক্ত করেছে বলে জানা গেছে।

গত ২১ জুন চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের সিটি কনভেনশন হলে চট্টগ্রাম সিটি করর্পোরেশনের উদ্যোগে চালু করা হয় একটি আইসোলেশন সেন্টার। আড়াই শত শয্যার আইসোলেশন সেন্টারটির উদ্বোধন করেন সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। চিকিৎসা নিয়ে নগরজুড়ে হাহাকারের মাঝেও সেখানে রোগী না যাওয়ায় ৫৫ দিনের মাথায় সেন্টারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, ওই ৫৫ দিনে ১২০ জন রোগীর জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ হিসেবে মাথাপিছু প্রতিজন রোগীর পেছনে খরচ হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। অথচ চিকিৎসাখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামান্য ওষুধ ও অক্সিজেন সেবায় এর ভগ্নাংশও খরচ হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে এর বিপরীতে তুলনামূলক জটিল করোনা রোগী সামাল দিয়েও হালিশহরে কিছু তরুণের উদ্যোগে পরিচালিত ‘আইসোলেশন সেন্টার চট্টগ্রামে’ রোগীপ্রতি খরচ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ১৭৮ টাকা। তিন মাসে অনুদাননির্ভর ওই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিয়েছে ৭৬৫ জন রোগী। সবমিলিয়ে সেখানে খরচ হয়েছে ৪৭ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা— জানিয়েছেন ওই সেন্টারের মুখপাত্র জিনাত সোহানা চৌধুরী।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত আইসোলেশন সেন্টারটি চালু হওয়ার পর সেখানে বিদ্যুৎ বিল কিংবা ভবন ভাড়াও লাগেনি। এমনকি সেখানে ছিল না আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর সুবিধাও। অনেকটা হেলাফেলায় গড়ে ওঠা ওই নামমাত্র আইসোলেশন সেন্টারে মাত্র ৫৫ দিনে জনপ্রতি রোগীর খরচ কিভাবে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা হতে পারে— এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসাখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই টাকায় একজন করোনা রোগী উন্নতমানের প্রাইভেট ক্লিনিকে আইসিইউ ভেন্টিলেটর সুবিধাসহ অন্তত ১৫ দিনের চিকিৎসাসেবা নিতে পারতেন।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত আইসোলেশন সেন্টারটি ১৩ জুন উদ্বোধনের মাত্র ৫৫ দিনের মাথায় রোগী সংকটে পড়ে গত ১৪ আগস্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সময় হাসপাতালে-ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়ে হাহাকার, এমনকি চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর একাধিক ঘটনা থাকলেও আইসোলেশন সেন্টারটি বিস্ময়করভাবে ছিল রোগীর নিদারুণ সংকটে।

চসিকের হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ দিনে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছে মাত্র ১২০ জন রোগী। এতো রোগী আদৌ সেখানে চিকিৎসা নিয়েছিল কিনা— এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও চসিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে ২ জন রোগী সেখানে সেবা পেয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদের এক্সেস রোডে সিটি কর্পোরেশনের ওই আইসোলেশন সেন্টারের সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন যান্ত্রিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাক। শুরুতেই দরপত্রবিহীন ২ কোটি টাকার বেশি খরচ দেখানো ছাড়াও হিসাবের গরমিলসহ নানা অভিযোগ উঠে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ— টিআইবি চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি এডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের আইসোলেশন সেন্টার করোনাকালীন জনপ্রতি রোগীর ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা যে খরচ দেখিয়েছে, তা অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সেবাখাতে এ ধরনের খরচের নজির খুব বেশি নেই। দেশের ক্রান্তিকালীন সময়ে এ ধরনের জঘন্য চুরি মোটেই সমীচীন নয়। এটা বহুল আলোচিত বালিশ কেলেংকারিকেও হার মানিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে চসিকের সামান্য ওষুধ ও অক্সিজেন সেবায় খুব বেশি খরচ হওয়ার কথাও নয়।’

সিটি কর্পোরেশনের যারাই এ দায়িত্বের সঙ্গে জড়িত যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকে বিষয়টি আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন টিআইবি চট্টগ্রামের এই ব্যক্তিত্ব।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সেলিম আক্তার চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সিটি কর্পোরেশনের আইসোলেশন সেন্টারে অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এতে যান্ত্রিক শাখার ভারপ্রাপ্ত তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাক, ডা. সুশান্ত বড়ুয়া, প্রকৌশলী সালমা, বিদ্যুৎ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার, স্টোরের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী ও নেজারত শাখার একজনসহ সবার কাছ লিখিত আকারে আইসোলেশন সেন্টারের কেনাকাটা ও খরচের তথ্য চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকেই লিখিত আকারে দিয়েছেন এসব তথ্য।’

সেলিম আক্তার চৌধুরী আরও বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে নেওয়া এসব তথ্য বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে কিনা তদারকি করা হবে। একই সঙ্গে বাজার কমিটির সঙ্গে তাদের তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখা হবে। পরবর্তীতে এসব যাচাইবাচাই করার পর রিপোর্ট দেওয়া হবে। শিগগিরই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক খোরশেদুল আলম সুজন বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আইসোলেশন সেন্টারের খরচ ও কেনাকাটার বিষয়টি আমলে নিয়ে একটি তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। সেখানে টেন্ডার ছাড়াই কিভাবে ৩-৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গঠিত কমিটি তদন্তের কাজ ইতিমধ্যে অনেকটা সম্পন্ন করেছে। তদন্তের প্রমাণ পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

ManaratResponsive

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন

জেলা প্রশাসনের অভিযানে একজনের ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড

কোর্ট বিল্ডিং এলাকার ফটোকপির দোকানে জাল খতিয়ানের ব্যবসা

ksrm