মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের প্রতিটি অক্ষর পাঠে সওয়াব থাকলেও কিছু নির্দিষ্ট সুরা ও আয়াতের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্যের কথা রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষভাবে ইরশাদ করেছেন। তেমনই এক বিস্ময়কর মহিমায় ভাস্বর পবিত্র কোরআনের দ্বিতীয় সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত, যা বিশ্বজুড়ে ‘আয়াতুল কুরসি’ নামে সুপরিচিত। লেখক ও গবেষক ফখরুল ইসলাম নোমানী এই আয়াতের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে একে কোরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, এই একটি আয়াতের মধ্যেই নিহিত রয়েছে আল্লাহর একত্ববাদ, মর্যাদা ও গুণের অনন্য বর্ণনা, যা মুমিন হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও সুরক্ষার চাদর বিছিয়ে দেয়।
কোরআনের শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনা
ইসলামি গবেষক ফখরুল ইসলাম নোমানীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই আয়াতটিকে কোরআনের শ্রেষ্ঠ আয়াত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ সুরা হলো ‘কুল হু আল্লাহু আহাদ’ এবং সবচেয়ে বড় আয়াত হলো ‘আয়াতুল কুরসি’। পুরো আয়াতে আল্লাহর মহিমা এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে এটি পাঠ করলে অসংখ্য পুণ্য লাভ হয়। এটি কেবল একটি আয়াত নয় বরং মুমিনের জন্য সুরক্ষা, বরকত, জান্নাতের প্রতিশ্রুতি এবং শয়তান থেকে মুক্তির প্রধানতম উপায় হিসেবে কাজ করে।
আল্লাহর গুণের নিখুঁত প্রকাশ
আয়াতুল কুরসির সুউচ্চ মর্যাদা ও ফজিলত বর্ণনায় একে কোরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত বলার কারণ হিসেবে এর তৌহিদ বা একত্ববাদের নিখুঁত উপস্থাপনাকে দায়ী করা হয়েছে। এখানে মহান আল্লাহ নিজেকে ‘আল হাইয়ুল কাইয়ুম’ বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। এর অর্থ হলো তিনি চিরঞ্জীব এবং তাঁর এই জীবন শাশ্বত ও অনন্ত। তাঁর অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই এবং শেষও নেই। তিনি সত্তাগতভাবেই বিদ্যমান এবং পুরো সৃষ্টিজগৎ পরিচালনার ধারক। তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন বরং সমস্ত সৃষ্টিই তাঁর মুখাপেক্ষী। এই আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং সমস্ত ইবাদত ও আনুগত্য কেবল তাঁরই প্রাপ্য।
আয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য
গবেষক ফখরুল ইসলাম নোমানী আয়াতের মূল পাঠ ও বাংলা অনুবাদ তুলে ধরেছেন। আয়াতটি হলো: ‘আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়ুম। লা তা খুজুহু সিনাতু ওয়ালা নাউম। লাহু মা ফিস সামা ওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ। মান জাল্লাজি ইয়াশ ফাউ ইনদাহু ইল্লা বি ইজনিহি, ইয়া লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম ওয়ালা ইউ হিতুনা বিশাই ইম মিন ইল মিহি ইল্লা বিমা শা আ, ওয়াসিয়া কুরসি ইউহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ, ওয়ালা ইয়া উদুহু হিফজুহুমা ওয়াহুয়াল আলি ইয়ুল আজিম।’ এর বাংলা অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি জীবিত সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর। কে আছে এমন যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর কুরসি বা সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।
জান্নাতের প্রতিশ্রুতি ও সুরক্ষা
প্রতিদিনের আমল হিসেবে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর এই আয়াত পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি প্রতি ফরজ নামাজ শেষে আয়াতুল কুরসি পড়েন তাঁর জান্নাতে প্রবেশ করতে মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো কিছু বাধা হবে না। ফখরুল ইসলাম নোমানী উল্লেখ করেন যে পুরো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র পাঁচ মিনিট ব্যয় করে এই আয়াতটি পড়লে শয়তানের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, যে ঘরে এটি পাঠ করা হবে সেখান থেকে শয়তান পালাতে থাকে। এমনকি রাতে ঘুমানোর সময় এটি পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের বালা-মসিবত থেকে হেফাজত করেন। সকালে পাঠ করলে বিকাল পর্যন্ত এবং বিকালে পাঠ করলে সকাল পর্যন্ত জিন ও শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয়ে থাকা যায়।
শয়তানের সেই জবানবন্দি
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত একটি দীর্ঘ ঘটনার মাধ্যমে এই আয়াতের মাহাত্ম্য ফুটে উঠেছে। একদিন আবু হুরায়রা (রা.) সদকার মাল চুরি করার সময় একজনকে ধরে ফেলেন। চোর নিজেকে অভাবী দাবি করলে তিনি তাকে ছেড়ে দেন। পরদিন সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে গতকাল তাঁর অপরাধীকে কী করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) সব জানালে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন যে সে মিথ্যা বলেছে এবং আবার আসবে। টানা তিন দিন ধরার পর চোর নিজেকে বাঁচাতে একটি গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়। সে বলে যে ঘুমানোর সময় আয়াতুল কুরসি পড়লে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন পাহারাদার নিযুক্ত হবে এবং সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান কাছে আসতে পারবে না। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিশ্চিত করেন যে যদিও সে চরম মিথ্যাবাদী, কিন্তু সে সত্য কথাটিই বলেছে এবং ওই ব্যক্তিটি ছিল স্বয়ং শয়তান।
তিন কুলের আমল ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা
আয়াতুল কুরসির পাশাপাশি ফজর ও মাগরিবের পর সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস বা ‘তিন কুল’ পাঠের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। মুআজ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে খুবাইব (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্ধকারে এক বৃষ্টির রাতে তাঁকে এই তিনটি সুরা সকালে ও সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়ার নির্দেশ দেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে এটি যাবতীয় অনিষ্ট হতে রক্ষার জন্য যথেষ্ট হবে। ফখরুল ইসলাম নোমানী তাঁর লেখায় জোর দিয়ে বলেন যে আয়াতুল কুরসি মুমিনদের জন্য ঢাল ও প্রশান্তি। এটি নিয়মিত পাঠ করার মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ সম্ভব এবং এটি মানুষের জীবন পাল্টে দিতে পারে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট




