এক নয়নের নিয়ন্ত্রণে সন্দ্বীপের নৌপথ, লাখো যাত্রী জিম্মি করে কোটি টাকার কারবার

ফেরি-স্পিডবোট-কাঠের বোট সবই একক নিয়ন্ত্রণে

চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের মানুষের কাছে নৌপথই জীবনরেখা। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই জনপদের মানুষের যাতায়াত নির্ভর করে কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌ রুটের ওপর। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই রুটের প্রায় পুরো ব্যবস্থাই এখন এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে। স্পিডবোট, কাঠের বোট, ছোট বোট থেকে শুরু করে ফেরি সার্ভিসের ইজারা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছেন জগলুল হাসান নয়ন। এতে করে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন সন্দ্বীপের লাখো মানুষ।

কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে অধিকাংশ নৌযানের মালিক জগলুল হাসান নয়ন। তাঁর নিয়ন্ত্রণেই চলে স্পিডবোট, কাঠের বোট ও ছোট বোট।
কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটে অধিকাংশ নৌযানের মালিক জগলুল হাসান নয়ন। তাঁর নিয়ন্ত্রণেই চলে স্পিডবোট, কাঠের বোট ও ছোট বোট।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাট দিয়ে চলাচলকারী অধিকাংশ নৌযানের মালিক জগলুল হাসান নয়ন। তাঁর নিয়ন্ত্রণেই চলে স্পিডবোট, কাঠের বোট ও ছোট বোট। যাত্রীদের অভিযোগ, সরকারি নৌ সংস্থা বিআইডব্লিউটিএর নির্দেশনা উপেক্ষা করেই নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালনা করা হয় এসব নৌযান।

এক নয়নের নিয়ন্ত্রণে সন্দ্বীপের নৌপথ, লাখো যাত্রী জিম্মি করে কোটি টাকার কারবার 1

এর আগে এই ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর একটি শিপ চলাচল করত। পরে নাব্যতা সংকটের কারণে সেটি সরিয়ে নেওয়া হয় বাঁশবাড়িয়া-গুপ্তছড়া ফেরিঘাটে। অভিযোগ রয়েছে, ওই শিপটিরও কমিশন এজেন্ট জগলুল হাসান নয়ন।

জুলাইয়ের পটপরিবর্তনের পর সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির মুখে এই রুটে ফেরি সার্ভিস চালু হয়। শুরুতে সেটি সিন্ডিকেটমুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে ফেরির ইজারাও নেন নয়ন। ফলে সন্দ্বীপ রুটে চলাচল করতে গেলে যাত্রীদের তাঁর নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

ভাড়া বৃদ্ধি ও স্পিডবোট বন্ধের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে সম্প্রতি স্পিডবোটের ভাড়া ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ জনপ্রতি ভাড়া বেড়ে যায় ৫০ টাকা। অথচ একই সময়ে লিটারপ্রতি জ্বালানির দাম বেড়েছে মাত্র ২০ টাকা। কাঠের বোটের ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ২০০ টাকা। স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রশাসনের কাছ থেকেও এ সিদ্ধান্তের বৈধতা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

পরে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা বাড়লে বিআইডব্লিউটিএ প্রজ্ঞাপন জারি করে স্পিডবোটের ভাড়া ২৬০ টাকা নির্ধারণ করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রজ্ঞাপন মানেননি নয়ন। বরং কোনো ঘোষণা ছাড়াই স্পিডবোট চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘাটে বিকল্প নৌযান না থাকায় যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈশাখের তপ্ত রোদে অপেক্ষা করেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি।

ফেরিতে যাত্রী নামানোর অভিযোগ

ফেরি সার্ভিস নিয়েও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন যাত্রীরা। অভিযোগ সূত্র বলছে, ফেরির যাত্রী টিকিটের ইজারা নেওয়ার পর অতিরিক্ত মুনাফার জন্য অনেক সময় গাড়ি না তুলে শুধু যাত্রী পারাপার করা হয়। এমনকি এই রুটে চলাচলকারী বাস ও অন্যান্য পরিবহন থেকে যাত্রীদের নামিয়ে খালি গাড়ি ঘাটে রেখে শুধু যাত্রী তুলতে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গত ঈদুল ফিতরে বিষয়টি সামনে আসে। পরিবহন মালিকদের অভিযোগ, লুসাই পরিবহনের একটি বাসের যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে আলাদা টিকিট কেটে ফেরিতে পারাপার করা হয়। ফলে শহরের হালিশহর থেকে সন্দ্বীপের শিবেরহাট বা ঘাটমাঝির হাট পর্যন্ত সরাসরি যাওয়ার কথা থাকলেও যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী ও বৃদ্ধ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।

ইজারা বাতিলের পরও একক নিয়ন্ত্রণ

তথ্য বলছে, গণঅভ্যুত্থানের পর দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তৎকালীন উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের উদ্যোগে নৌঘাটের ইজারা প্রথা বাতিল করা হয়। উন্মুক্ত করা হয় ঘাট ব্যবস্থাপনা। এতে নতুন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করে নৌযান পরিচালনার সুযোগ পায়।

এরপর সন্দ্বীপ মেরিন সার্ভিস নামে একটি প্রতিষ্ঠান ঘাটে কার্যক্রম শুরু করলেও কয়েক মাসের মধ্যে তারা ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, শুরু থেকেই ওই প্রতিষ্ঠানটি নয়ন গ্যাংয়ের বাধার মুখে পড়েছিল। একাধিকবার তাদের কাউন্টার ভাঙচুরসহ নানা ধরনের হয়রানি করা হয়। ফলে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানও ঘাটে সেবা দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

‘ক্ষমতা যার, নয়ন তার’

চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন সন্দ্বীপ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চেয়ারম্যানের ছত্রছায়ায় ব্যবসা পরিচালনা করতেন জগলুল হাসান নয়ন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় আনোয়ার ও নয়ন বাহিনীর বিরুদ্ধে যাত্রীদের হয়রানি ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

২০২৩ সালের কোরবানির ঈদে কুমিরা ঘাটে যাত্রীদের আটকে রাখার প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা ঘটে। পরে আনোয়ার ও নয়ন বাহিনী ৭০ জনকে আসামি করে মামলা দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই মামলায় নয়নের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল বলেও দাবি করেন অভিযোগকারীরা।

জুলাই আন্দোলনের পর সরকার পরিবর্তনের পর আনোয়ার এলাকা ছাড়লেও নয়ন বিএনপি পরিচয়ে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যাত্রীরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও ঘাটে তাঁর একক নিয়ন্ত্রণ বদলায়নি।

ঈদযাত্রায় নতুন শঙ্কা

সামনে ঈদকে ঘিরে আবারও দুর্ভোগের আশঙ্কা করছেন সন্দ্বীপবাসী। তাঁদের আশঙ্কা, বিআইডব্লিউটিএর চাপের মুখে ২৬০ টাকায় স্পিডবোট চালাতে বাধ্য হওয়ায় নতুন করে ভোগান্তির কৌশল নেওয়া হতে পারে। স্পিডবোট বন্ধ রাখা, ফিটনেসবিহীন কাঠের বোটে যাত্রী পরিবহন কিংবা ফেরিতে বাস থেকে যাত্রী নামিয়ে আলাদা টিকিট কাটতে বাধ্য করার মতো ঘটনা আবারও ঘটতে পারে বলে শঙ্কা তাঁদের।

তবে জগলুল হাসান নয়ন সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের কথা মতো তো বোট ছাড়া যায় না। তাঁদের কথা মতো ছাড়লে দুর্ঘটনায় পড়তে হবে।’ ঘাটে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি তো কাউকে ঘাটে ব্যবসা করতে নিষেধ করিনি।’

ফেরিতে বাস থেকে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন নিয়ম অনুযায়ী বাস থেকে যাত্রীদের নেমে ফেরিতে উঠতে হয়। সে ক্ষেত্রে তাঁদের আলাদা টিকিট সংগ্রহ করতে হয়।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কর্মকর্তা বলেন, ঘাটে আরও প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে আসুক সেটিই তারা চান। প্রয়োজনে নতুন প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তাও দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সিপি

ksrm