এক কাতারে ধনী-গরিব, আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উদ্‌যাপিত হচ্ছে কোরবানির ঈদ

বছর ঘুরে আবার এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমানদের জীবনের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব এই ঈদ উদ্‌যাপিত হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে)। হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী জিলহজ মাসের ১০ তারিখে উদ্‌যাপিত হয় ঈদুল আজহা। ঈদুল ফিতরের মতো এ ঈদে চাঁদ দেখা নিয়ে শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা থাকে না। প্রায় ১০ দিন আগেই নির্ধারিত হয়ে যায় ঈদের দিনক্ষণ। তাই পশু কেনা থেকে শুরু করে গ্রামের বাড়িতে ফেরা পর্যন্ত সব প্রস্তুতিও আগেভাগেই সেরে নেন মানুষ।

আজ সারা দেশে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত হচ্ছে কোরবানির ঈদ। আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর মিলনমেলায় আবারও মুখর হয়ে উঠেছে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ও পথের দুর্ভোগ উপেক্ষা করে মানুষ পৌঁছে গেছে প্রিয়জনের কাছে। এই ত্যাগের মধ্য দিয়েই মিলনের আনন্দ আরও গভীর হয়েছে।

ঈদ মানেই আনন্দ আর খুশি। ধনী-নির্ধন সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন অথবা পরিষ্কার পোশাক পরে, গায়ে আতর-সুগন্ধি মেখে মসজিদ কিংবা ঈদগাহে এক কাতারে দাঁড়াবেন। নামাজ শেষে বুকে বুক মিলিয়ে ছড়িয়ে দেবেন ভ্রাতৃত্বের বার্তা।

এরপর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আশায় সামর্থ্য অনুযায়ী দেওয়া হবে পশু কোরবানি। প্রত্যেক আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি দিল না, সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে।’

বাংলাদেশে সাধারণত গরু, ছাগল কিংবা মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে দুম্বা, ভেড়া ও উট কোরবানি দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। এই অঞ্চলে বহু বছর আগে সাধারণত বকরি বা ছাগল কোরবানি দেওয়া হতো। সে কারণেই একসময় এই ঈদ পরিচিত ছিল ‘বকরি ঈদ’ বা ‘বকরিদ’ নামে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এ অঞ্চলে গরু কোরবানির প্রচলন বাড়তে থাকে।

কোরবানির পর মাংস তিন ভাগে বণ্টনের রীতি ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর মধ্যে এক ভাগ রাখেন কোরবানিদাতা, আর বাকি দুই ভাগ আত্মীয়স্বজন ও গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়। সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান থেকেই ধর্মে এই বণ্টনব্যবস্থা গুরুত্ব পেয়েছে।

ত্যাগ ও আনুগত্যের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আজহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অনন্য আত্মত্যাগের ঘটনা। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)। পরে আল্লাহর অশেষ রহমতে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে কোরবানি হয় একটি দুম্বা। ঈদুল আজহা তাই আত্মত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। মনের ভেতরের পশুত্বকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহভীতির চর্চার মধ্য দিয়ে নিজেকে শুদ্ধ করার আহ্বান জানায় এই উৎসব।

চট্টগ্রামে প্রধান ঈদ জামাত

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে পবিত্র ঈদুল আজহার প্রথম ও প্রধান জামাত নগরের জমিয়তুল ফালাহ্ মসজিদ প্রাঙ্গণে আজ সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত হয়। একই স্থানে দ্বিতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৮টায়।

প্রথম জামাতে ইমামতি করেন জমিয়তুল ফালাহ্ মসজিদের খতিব সৈয়দ আবু তালেব মোহাম্মদ আলাউদ্দীন আল কাদেরী। দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করেন মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ আহমদুল হক।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে নগরের আরও নয়টি মসজিদে সকাল ৮টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। মসজিদগুলো হলো লালদীঘি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন শাহী জামে মসজিদ, হযরত শেখ ফরিদ (র.) চশমা ঈদগাহ মসজিদ, সুগন্ধা আবাসিক এলাকা জামে মসজিদ, চকবাজার সিটি কর্পোরেশন জামে মসজিদ, জহুর হকার্স মার্কেট জামে মসজিদ, দক্ষিণ খুলশী ভিআইপি আবাসিক এলাকা জামে মসজিদ, আরেফীন নগর কেন্দ্রীয় কবরস্থান জামে মসজিদ, সাগরিকা গরুবাজার জামে মসজিদ এবং মা আয়েশা সিদ্দিকা (র.) চসিক জামে মসজিদ।

কারাগারে বিশেষ আয়োজন

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ আয়োজন। উঁচু দেয়াল, লোহার গেট ও কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে থাকা বন্দিদের ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে প্রতি বছরের মতো এবারও বিশেষ খাবার, ঈদের জামাত ও স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছে কারা কর্তৃপক্ষ।

ঈদের দিন আজ সকালে কারাগারে দুটি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম জামাতে অংশ নেন কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। পরে বন্দিদের জন্য আয়োজন করা হয় পৃথক জামাত।

কারাগারের প্রায় ছয় হাজার বন্দির জন্য ঈদ উপলক্ষে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। সকালে দেওয়া হবে সেমাই ও মুড়ি। দুপুরে পরিবেশন করা হবে পোলাও, গরু বা খাসির মাংস, মুরগির রোস্ট, সালাদ এবং পান-সুপারি। রাতের মেন্যুতে থাকবে সাদা ভাত, আলুর দম ও রুই মাছ ভাজা।

ksrm