ইংরেজি-গণিতে ‘শিট’ মুখস্থ করে ফেল ৫৩ হাজার, চট্টগ্রামে এসএসসির ফলে বড় ধাক্কা

প্যাসেজ বুঝে উত্তর, যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা, রুব্রিক্সে কড়াকড়ি

চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে এবারের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় উপস্থিত ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন। পাস করেছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন, ফেল করেছে ৫৩ হাজার ২২৯ জন। এর মধ্যে ইংরেজি বিষয়েই ফেল করেছে ৩৫ হাজার ৮৬৬ জন, আর গণিতে ২৫ হাজার ৭৭৩ জন। ইংরেজি ও গণিত—দুই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ফেল হওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এছাড়া বিজ্ঞানে ৯৪ হাজার ৫৭৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেল করেছে ৬ হাজার ৯৬১ জন। বাংলায় ফেল করেছে ৪ হাজার ৫৭ জন, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যায় ৩ হাজার ৩৭৩ জন, উচ্চতর গণিতে ফেল করেছে ২ হাজার ৯২৮ জন। এর মধ্যে আবার অনেকে একাধিক বিষয়ে ফেল করেছে। সে হিসেবে সব বিষয়ে মিলে এই ফেলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ২৬৯ জন।

এবার চট্টগ্রাম বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফেলের হার ২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ, পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ৭০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন, গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন।

ফলাফলের এই বড় পতনের পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি নয়, পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন ও খাতা মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতিও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মুখস্থের বদলে পাঠবোধের পরীক্ষা

২০২৬ সালের সিলেবাস অনুযায়ী ইংরেজি প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবার প্রশ্নের বড় একটি অংশে সরাসরি মুখস্থ তথ্যের পরিবর্তে পাঠবোধ, প্রসঙ্গ অনুযায়ী শব্দের অর্থ নির্ণয়, তথ্য বিশ্লেষণ, যুক্তি দিয়ে উত্তর দেওয়া, সারাংশ লেখা, বাক্য গঠন এবং ঘটনাক্রম সাজানোর দক্ষতা যাচাই করা হয়েছে।

প্রশ্নপত্রের প্রথম সাতটি প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য মনে রাখলেই এবার ভালো করার সুযোগ ছিল সীমিত। একটি প্যাসেজ পড়ে তার মূল বক্তব্য বোঝা, প্রয়োজনীয় তথ্য বের করা, তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করা এবং নিজের ভাষায় উত্তর প্রকাশের সক্ষমতা দেখাতে হয়েছে পরীক্ষার্থীদের।

প্রথম প্যাসেজে কার্বন ডাই-অক্সাইড, জীবাশ্ম জ্বালানি, বন উজাড়, গ্রিনহাউস গ্যাস ও গ্রিনহাউস প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিষয়গুলো পরিচিত হলেও প্রশ্নগুলো ছিল এমন, যেখানে শুধু প্যাসেজ থেকে একটি বাক্য তুলে দিলেই উত্তর পাওয়া যায়নি।

‘শোষণ করা’, ‘দহন’, ‘অপরিশোধিত তেল’-এর মতো শব্দের অর্থও প্রসঙ্গ বুঝে নির্ধারণ করতে হয়েছে। অর্থাৎ শব্দার্থকে আলাদা করে মুখস্থ না করে প্যাসেজে শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তা বুঝে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল।

এখানেই প্রশ্নপত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ধরা পড়ে—শব্দের বাংলা অর্থ মুখস্থ করার পরিবর্তে শব্দটি বাক্য ও প্রসঙ্গের মধ্যে কী অর্থ বহন করছে, সেটিই যাচাই করা হয়েছে।

তথ্য নয়, দিতে হয়েছে ব্যাখ্যাও

দ্বিতীয় প্রশ্নে জীবাশ্ম জ্বালানি, পরিবেশ রক্ষায় গাছের ভূমিকা, গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর উপায় এবং গ্রিনহাউস প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। এসব প্রশ্নের ক্ষেত্রে শুধু প্যাসেজের বাক্য তুলে দেওয়ার পরিবর্তে, তথ্য বুঝে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয়েছে। বিশেষ করে মানুষের কর্মকাণ্ডে গ্রিনহাউস প্রভাব কতটা শক্তিশালী হচ্ছে—এ ধরনের প্রশ্নে তথ্যের সঙ্গে যুক্তি মিলিয়ে উত্তর দিতে হয়েছে।

অর্থাৎ প্রশ্নপত্রে শিক্ষার্থীর ‘তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা’র পাশাপাশি ‘তথ্য ব্যবহার করার ক্ষমতা’ও যাচাই করা হয়েছে।

শূন্যস্থান পূরণেও ‘পরীক্ষা’

তৃতীয় প্রশ্নের শূন্যস্থান পূরণ অংশেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এখানে শুধু একটি শব্দ মুখস্থ থাকলেই উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়; পুরো বাক্যের অর্থ ও ব্যাকরণগত কাঠামো বুঝতে হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ঘরবাড়ি, পৃথিবীর উষ্ণতা ও বন—এসব তথ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝে ধারাবাহিকভাবে উত্তর বসাতে হয়েছে।

ফলে শূন্যস্থান পূরণও নিছক শব্দ মনে রাখার পরীক্ষা না হয়ে পাঠের অর্থ অনুধাবনের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

ছিল তথ্য সাজানোর পরীক্ষা

ওয়াল্ট হুইটম্যানকে নিয়ে দেওয়া প্যাসেজে তার জন্ম, ‘লিভস অব গ্রাস’ প্রকাশ, গৃহযুদ্ধের সময়কার কর্মকাণ্ড, স্ট্রোকের পর স্থান পরিবর্তন এবং মৃত্যু—বিভিন্ন ঘটনা ও সময়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এখানে ১৮৫৫, ১৮৬১, ১৮৭৩ ও ১৮৯২ সালের ঘটনাগুলো আলাদাভাবে শনাক্ত করে সময়ের ধারাবাহিকতায় সাজাতে হয়েছে।

অর্থাৎ পরীক্ষার্থীদের তথ্য বিচ্ছিন্নভাবে মুখস্থ না করে ঘটনা, সাল ও স্থানের মধ্যে সম্পর্ক বুঝে নেওয়ার দক্ষতা দেখাতে হয়েছে।

মূল তথ্য শনাক্তের চ্যালেঞ্জ

ওয়াল্ট হুইটম্যানের প্যাসেজের ওপর সারাংশ লেখার প্রশ্নটি ছিল পরীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি দীর্ঘ প্যাসেজ থেকে মূল বক্তব্য ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেছে নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিবরণ বাদ দিয়ে নিজের ভাষায় সংক্ষেপে প্রকাশ করতে হয়েছে। এ ধরনের প্রশ্ন মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি দিয়ে সহজে মোকাবিলা করা কঠিন।

ইংরেজি বিষয়ে পাঠদানকারী শিক্ষকদের মতে, সারাংশ লেখার জন্য মূলত তিনটি দক্ষতা প্রয়োজন—মূল তথ্য শনাক্ত করা, অপ্রয়োজনীয় তথ্য বাদ দেওয়া এবং নিজের ভাষায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা।

ব্যাকরণের সঙ্গে বাক্য তৈরি দক্ষতা

ষষ্ঠ প্রশ্নে তিনটি কলামের অংশ মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ বাক্য তৈরি করতে হয়েছে। এখানে শুধু ব্যাকরণগত সামঞ্জস্য নয়, বাক্যের অর্থও বিবেচনায় নিতে হয়েছে। ভূমিকম্পে মাটি কাপা, উঁচু ভবন ধসে পড়া, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং ভবন নির্মাণবিধি মেনে চলার মতো ধারণাগুলোকে যৌক্তিকভাবে মিলিয়ে বাক্য তৈরি করতে হয়েছে।

ব্যাকরণের নিয়ম জানার পাশাপাশি কোন অংশের সঙ্গে কোন অংশ যুক্ত হলে অর্থপূর্ণ বক্তব্য তৈরি হয়, সেটিও বুঝতে হয়েছে।

গল্পে ধারাবাহিকতায় জোর

সপ্তম প্রশ্নে শেখ সাদীর গল্পের বিভিন্ন বাক্য সঠিক ক্রমে সাজাতে হয়েছে। এখানে প্রতিটি বাক্য আলাদাভাবে মুখস্থ করার চেয়ে পুরো গল্পের ধারাবাহিকতা বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোন ঘটনার পর কোন ঘটনা ঘটেছে, কোনটি আগে এবং কোনটি পরে—এসব নির্ধারণের পাশাপাশি কারণ ও পরিণতির সম্পর্কও বুঝতে হয়েছে।
ফলে গল্প পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নটিও মুখস্থের পরিবর্তে পাঠবোধ ও ঘটনাক্রম বোঝার দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল হয়েছে।

রুব্রিক্স পদ্ধতিতে কমেছে নম্বর

ইংরেজি ও গণিতে ফেলের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এ পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ‘গণিত ও ইংরেজির খাতা মূল্যায়নে রুব্রিক্স পদ্ধতি অনুসরণ করায় নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে চলতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘গণিত ও ইংরেজি খাতায় rubrics বা প্রতিবর্ণীকরণ পদ্ধতি ফলো করতে গিয়ে নম্বর কমে গেছে শিক্ষার্থীদের। খাতায় নম্বর বণ্টনে অযথা নম্বর দেওয়া হয়নি। এবছরসহ গত দুই বছর ধরে রুব্রিক্স পদ্ধতিতে খাতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রথম বছর শুধু ইংরেজি ও গণিতে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও গত দুই বছর ধরে সব বিষয়েই এ পদ্ধতিতে খাতা মূল্যায়ন করছেন পরীক্ষকরা।

কোচিংনির্ভরতায় পিছিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এ পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী মনে করেন, ইংরেজি ও গণিতে কোচিংনির্ভরতার কারণেও শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোচিংয়ে তৈরি করা লেকচার শিট অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তৈরি করেন। তারা এনসিটিবির নিয়ম-কানুন ও পাঠ্যক্রমের কাঠামো সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না রাখায় মূল পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে এসব শিটের ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় সমস্যায় পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘মূল পাঠ্য বই পড়ার বিকল্প নেই। যারা মূল পাঠ্যবই বাদ দিয়ে কোচিংনির্ভর প্রস্তুতিতে বেশি সময় দিয়েছে, তাদের অনেকেই ভালো করতে পারেনি, এমনকি জিপিএ-৫-ও অর্জন করতে পারেনি।’

পার্বত্য তিন জেলায় বেশি ফেল

চট্টগ্রাম বোর্ডের তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানে ফেলের হার তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এ পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী।

এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি দক্ষ শিক্ষক সংকটের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এসব এলাকায় দক্ষ শিক্ষক পাওয়া কঠিন হওয়ায় দক্ষ পাঠদানের ঘাটতি রয়েছে। আর সেই ঘাটতির প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে।

পরিবর্তন দরকার প্রস্তুতিতে

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এ পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানোর পরিবর্তে শিক্ষককে শেখাতে হবে—কেন উত্তরটি সঠিক, প্যাসেজের কোন তথ্য থেকে উত্তরটি পাওয়া গেল এবং কীভাবে সেটিকে নিজের ভাষায় প্রকাশ করা যায়।

অভিভাবকদেরও শুধু সন্তান কত পৃষ্ঠা পড়েছে বা কত প্রশ্ন মুখস্থ করেছে, তা না দেখে সে একটি প্যাসেজ পড়ে কতটা বুঝতে পারছে এবং নিজের ভাষায় তা ব্যাখ্যা করতে পারছে কি-না, সেদিকে নজর দিতে হবে বলেন পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী্।

তিনি বলেন, নতুন ধরনের প্রশ্নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ধরনেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একটি প্যাসেজ প্রথমবার পড়তে হবে মূল বিষয় বোঝার জন্য। দ্বিতীয়বার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চিহ্নিত করতে হবে। তৃতীয়বার কে, কী, কেন, কখন ও কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।

ডিজে

ksrm