মৃত্যু পরবর্তী জীবন বা কবরের জগৎকে ইসলামি তাফসীরে বলা হয় ‘আলমে বারজাখ’। ‘আলম’ অর্থ জগৎ, ‘বারজাখ’ অর্থ পর্দা বা আবরণ। মৃত্যুর পর থেকে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের রূহ এই জগতে অবস্থান করবে। দেহ কবরের মাটিতে হোক বা সমুদ্রে, শূলিতে চড়া হোক বা ভস্ম হয়ে যাক, রূহ সবসময় বারজাখে অবস্থান করবে। এটি দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যবর্তী জগৎ, যেখানে কবরের প্রশ্নোত্তর, আজাব ও শান্তি নির্ধারিত হয়।
কবরের গুরুত্ব ও নবীর শিক্ষা
হজরত উসমান (রা.) বলেছেন, তিনি যখন কবরের পাশে যেতেন, কান্নায় তার দাড়ি ও বুক ভিজে যেত। সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা শুনলেও এত কান্না করেন না, কবরের পাশে এসে কেন এত কাঁদেন? তিনি বলেছিলেন, তিনি হুজুর (সা.) থেকে শুনেছেন, ‘কবর আখেরাতের প্রথম ধাপ। যারা এখানে মুক্তি পাবে, তাদের জন্য পরবর্তী ধাপ সহজ হবে। যারা ব্যর্থ হবে, তাদের জন্য পরবর্তী ধাপ কঠিন হবে।’
নবী করিম (সা.) বলেছেন, কবর হবে জান্নাতের বাগান অথবা জাহান্নামের গর্ত। হাদিসে এসেছে, কবর আখেরাতের প্রথম মঞ্জিল। এখানে মুক্তি পাওয়া সহজ করে দেয় পরবর্তী ধাপগুলো, আর ব্যর্থ হলে পরবর্তী ধাপগুলো কঠিন হয়ে যায়।
নবী করিম (সা.) কবরের আজাব থেকে রক্ষা পেতে দোয়া পড়তেন—‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবিল কাবরি’। অর্থ: হে আল্লাহ! আমি কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই।
কবরের আজাবের প্রমাণ
কোরআন সরাসরি কবরের আজাব উল্লেখ না করলেও বারজাখের অবস্থার মাধ্যমে প্রমাণ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ফেরাউনের অনুসারীদের প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় জাহান্নামের আগুনের সামনে উপস্থাপন করা হবে। কেয়ামত প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের কঠিন আজাব দেওয়া হবে।
কোরআনে মুনাফিকদের জন্য দুইবার আজাবের কথাও বলা হয়েছে। প্রথমবার দুনিয়ায় রোগ, শোক ও বিপদ, দ্বিতীয়বার কবরের আজাব। পরে কেয়ামত সংঘটিত হলে মহা-আজাব দেওয়া হবে। তাফসিরে ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে, এই দ্বি-পর্যায় আজাব কবরের গুরুত্ব প্রমাণ করে।
কবরের আজাবের কারণ
কবরের আজাবের কারণ অনেক। ইসলামি গ্রন্থে বিশেষভাবে উল্লেখ আছে—
১. শিরক করা: আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার করা সবচেয়ে বড় গুনাহ। কোরআনে বলা হয়েছে, যারা শিরক করবে, তাদের জন্য জান্নাত হারাম ও জাহান্নাম নিশ্চিত। (সুরা মায়েদা : ৭২)
২. মুনাফিকি স্বভাব: মুখে ইসলাম স্বীকার, অন্তরে অবিশ্বাসী বা প্রতারক। কোরআনে বলা হয়েছে, মুনাফিক পুরুষ ও নারীদের জন্য জাহান্নামের আগুন নিশ্চিত। (সুরা তাওবা : ৬৮)
৩. নামাজ ত্যাগ করা: প্রাপ্তবয়স্ক ও জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমানের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ। হাদিসে বলা হয়েছে, কাজা নামাজ না পড়লে ফেরেশতা লৌহদণ্ড দিয়ে আঘাত করবে।
৪. গিবত বা পরনিন্দা করা: ইসলামে গিবত অত্যন্ত জঘন্য। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) দুটি কবরের পাশে থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, একজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে গিবতের জন্য।
৫. প্রস্রাবের পর পবিত্রতা অর্জনে অবহেলা: হাদিসে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মানুষের কবরের আজাবের কারণ।
৬. অন্যান্য কারণ: সুদ ও ঘুষ খাওয়া, ঋণ পরিশোধ না করা, ব্যভিচার, মিথ্যা বলা, হারাম গান-বাজনা শোনা, ব্যবসায় ওজনে কম দেওয়া, প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা।
কবরের প্রশ্ন-উত্তর
কবরের মুনকার-নাকির ফেরেশতা তিনটি প্রশ্ন করবেন—
তোমার রব কে?
তোমার দ্বীন কী?
তোমার নবী কে?
যে মুমিন সতর্ক ও ঈমানদার, সে সঠিকভাবে উত্তর দিতে পারবে।
কবরের শান্তি ও মুক্তির উপায়
প্রতিদিন এশার নামাজের পর রাতে ঘুমানোর আগে সূরা তাবারাকাল্লা (সূরা মুলক) তিলাওয়াত করলে মৃত্যুর পর কবরের আজাব মাফ হবে।
নিয়মিত সুরা ইয়াসিন ও আয়াতুল কুরসির পাঠ মৃত্যুর কষ্ট ও পরকালের শান্তি আনতে সাহায্য করে।
নবী করিম (সা.) দোয়া পড়তেন—‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবিল কাবরি’।
নামাজ, পবিত্রতা, দান, নৈতিকতা ও আল্লাহর আনুগত্য বজায় রাখা কবরের শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষণীয় দিক
কবরের জগৎ আমাদের সতর্কবার্তা দেয়। নেককাররা জান্নাতের শান্তি, দুষ্টরা আজাব ভোগ করবে। মৃত্যুর আগে নেক আমল ও নিয়মিত ইবাদত কবরের কষ্ট কমাতে পারে। দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনকে সমন্বয় করতে পারা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব।
লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট




