আফগানিস্তানের মরণ কামড়ে জয়ের আগে কাঁপলো ভারত

শামির হ্যাটট্রিকে শেষ ওভারে গিয়ে ভারতের জয়

0

আফগানিস্তানের বিপক্ষে আগের ম্যাচে রশিদ খানদের তুলাধোনা করে ইংল্যান্ড করেছিল প্রায় চারশ ছুঁই ছুঁই ইনিংস। সেটির পর শনিবার (২২ জুন) সাউদাম্পটনে সেই ভঙ্গুর আফগানিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যাটিং সমৃদ্ধ দল ভারত নিজেদের স্কোর কোথায় নিয়ে গিয়ে থামায় সেটিই ছিল দেখার বিষয়। একদিকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার, টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকে নামা ভারত। অন্যদিকে ধুঁকতে ধুঁকতে টানা পাঁচ হারে তলানির আফগানিস্তান। বিপরীতমুখী শক্তির দুদলের লড়াইয়ে কোহলিদের মাত্র ২২৪ রানে আটকে ক্রিকেট বিশ্বকেই চমকেই দিয়েছিলেন রশিদ-নবিরা।

আফগানিস্তানের মরণ কামড়ের পরও শেষ হাসি অবশ্য ভারতেরই, মোহাম্মদ সামির হ্যাটট্রিকের পর ১১ রানের জয়ে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে তাদের। বিশ্বকাপের দুবারের চ্যাম্পিয়নদের যেটি বিশ্ব আসরে ৫০তম জয়। আর দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক। ১৯৮৭ আসরে চেতন শর্মা হ্যাটট্রিক করেছিলেন। সেটি ছিল বিশ্বকাপেরই প্রথম হ্যাটট্রিক। ৩২ বছর পর সেখানে আরেক ভারতীয় নাম লেখালেন, এবারের নামটি মোহাম্মদ সামি।

আফগানিস্তানের মরণ কামড়ে জয়ের আগে কাঁপলো ভারত 1
বিশ্বকাপের এবারের আসরের প্রথম হ্যাটট্রিক করলেন শামি

সবমিলিয়ে বিশ্বকাপে এটি দশম হ্যাটট্রিক। চেতন শর্মা, সাকলায়েন মুশতাক, চামিন্ডা ভাস, ব্রেট লি, লাসিথ মালিঙ্গা, কেমার রোচ, স্টিভেন ফিন ও জেপি ডুমিনির পাশে বসলেন সামি। এদের মাঝে মালিঙ্গা দুদিক থেকে ব্যতিক্রম। এই শ্রীলঙ্কান বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করেছেন দুবার, ২০০৭ ও ২০১১ আসরে, ২০০৭ আসরে তো টানা চার বলে উইকেট নিয়েছিলেন।

বিশ্বকাপ জমে গেছে গতকালই। শ্রীলঙ্কা যখন ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল হেডিংলিতে। শনিবার সাউদাম্পটনে তার চেয়ে বড় অঘটনের জন্ম নিতে যাচ্ছিল। আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানরা পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলতে না পারায় বড় বাঁচা বেঁচে গেছে ভারত। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১১ রানে হারিয়ে তিনে চলে এসেছে ভারত। আর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়া নিশ্চিত হলো আফগানিস্তানের।

আগেরদিন ধীর গতির উইকেটের পূর্ণ সুযোগ নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। এ ধরনের উইকেটে ব্যাটিং করতে অনভ্যস্ত ইংল্যান্ড রান তাড়ার পরিকল্পনাই সাজাতে পারেনি। গতকাল ধীর গতির উইকেট কাজে লাগিয়ে ভারতের রানবন্যা আটকে দিয়েছে আফগানিস্তান। কিন্তু ২২৫ রানের লক্ষ্যে নেমে বোলিংয়ে দেখানো বুদ্ধির প্রয়োগ দেখাতে পারেনি ব্যাটসম্যানরা। একমাত্র মোহাম্মদ নবী শেষ পর্যন্ত ভারতকে আতঙ্কে রেখেছিলেন। শেষ ওভারে ১৬ রানের সমীকরণে প্রথম বলে চারও মেরেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় বলে লং অনের লম্বা বাউন্ডারি দিয়ে ছক্কা মারতে গিয়ে ফিরেছেন নবী (৫২)। আফগানিস্তানেরও আর অঘটনের জন্ম দেওয়া হয়নি।

আফগানিস্তানের মরণ কামড়ে জয়ের আগে কাঁপলো ভারত 2
নবী এককভাবে আফগানিস্তানকে জয়ের বন্দরে নোঙর করার চেষ্টা করেও পারেননি।

ইনিংসের শুরুতে হজরতউল্লাহ জাজাই ফিরে গেলেও পথ হারায়নি আফগানিস্তান। গুলবদিন নাইব ও রহমত শাহ দলকে ভালো শুরু এনে দিয়েছিলেন। দলীয় ৬৪ রানে ধৈর্য হারালেন নাইব। পান্ডিয়াকে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফিরলেন সবাইকে বিস্মিত করে ইনিংস উদ্বোধন করতে নামা নাইব (২৭)।

আফগানিস্তান তাদের ইনিংসের অন্যতম সেরা সময় কাটিয়েছে এরপর। এ দলের সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার দুজন রহমত ও হাশমতউল্লাহ শহীদি দারুণভাবে সামাল দিয়েছেন ভারতের দুই রিস্ট স্পিনারকে। কিন্তু ম্যাচটা এক ওভারেই ভারতের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন যশপ্রীত বুমরা। ৪২ রানের জুটির দুই অংশীদারকেই তিন বলের মধ্যে ফেরত পাঠিয়েছেন বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে। শেষ ওভারে হ্যাটট্রিকসহ ৪ উইকেট পেয়েও তাই ম্যাচ সেরার পুরস্কারটি বুমরার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেননি মোহাম্মদ শামি।

শামি গতকাল প্রথম স্পেলে দুর্দান্ত বল করেছেন। জাজাইকে আউট করে আফগানিস্তানকে প্রথম ধাক্কা দিয়েছেন। শেষ ওভারে চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রেখে নবীকে আউট করে পরের দুই বলে হ্যাটট্রিক বুঝে নিয়েছেন, ১ বল হাতে রেখে অলআউট করে দিয়েছেন আফগানিস্তানকে। অথচ এই শামিই দলে ঢুকেছেন ভুবনেশ্বর কুমার চোটে পড়েছেন বলেই। ভারতের বোলিং বিভাগের গভীরতা এতটাই!

এ গভীরতাই ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। বিরাট কোহলি ছাড়া অন্য ব্যাটসম্যানরা সবাই স্পিনের সামনে নতজানু হয়ে পড়লেন। অথচ এ উইকেটে যে চাইলেই স্পিনারদের খেলা যায় সেটা বোঝা গেছে চাহাল ও কুলদীপ যাদবের মাত্র ২ উইকেট পাওয়াতে। রহমত ও শহীদির পর নবী ছাড়া আর কেউ বুদ্ধি খাঁটিয়ে ব্যাট করতে পারেননি। আর ভারতের বৈচিত্র্যময় বোলিং লাইন আপের বিপক্ষেও আফগানিস্তানের স্বভাবজাত আক্রমণাত্মক ব্যাটিং কাজে আসেনি। নজিবউল্লাহ জাদরান ও রশিদ খান একটু সময় কাটিয়েছেন বটে কিন্তু বুমরা, পান্ডিয়া ও শামিদের সঙ্গে পেড়ে ওঠেননি তারা।

আফগানিস্তানের মরণ কামড়ে জয়ের আগে কাঁপলো ভারত 3
আফগান বোলারদের মরণ কামড়ে ভারতের অন্য ব্যাটসম্যানরা হিমশিম খেলেও নান্দনিক এক ইনিংস খেলেন বিরাটি কোহলী

সাউদাম্পটনে ধীরগতির পিচে শুরুতে ব্যাট করে নির্ধারিত ওভারে ৮ উইকেটে ২২৪ রান জমাতে পারে ভারত। ভারতের ইনিংসের অর্ধেক পথ পার হতে বোঝা গেলো সাউদাম্পটনের এই উইকেট স্লো। এটা কোনোমতেই তিনশ’/সাড়ে তিনশ’ রানের উইকেট না। অধিনায়ক বিরাট কোহলি ছাড়া আর কোনো ভারতীয় ব্যাটসম্যানকে এই উইকেটে স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাট করতে দেখা গেলো না। হাফসেঞ্চুরি করলেই সেটাকে আরো বিরাট করার কৃতিত্ব আছে বিরাট কোহলির। তবে এবার হলো না। ৬৩ বলে ৬৭ রান করে আউট হলেন মোহাম্মদ নবীর অফস্পিনে।

শুরুতে মুজিব এবং মাঝে ও শেষে মোহাম্মদ নবী-রশিদ খান এই তিন আফগান স্পিনার সাউদাম্পটনের উইকেটে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের পরীক্ষা নিলেন। সেই পরীক্ষায় সবচেয়ে কম নম্বর পাচ্ছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। ৫২ বলে তার ২৮ রানের ইনিংস বিশ্বকাপের সামনের সময়টায় ধুন্ধুমার সমালোচনার বিষয় হয়ে উঠলো। ধোনি আউট হতেই দাবি উঠে গেলো রিভাস পান্থকে খেলাও তার জায়গায়!

উইকেট জমা থাকলেও শেষের ব্যাটিংয়েও ভারত হাত খুলে খেলতে পারলো না। আফগান স্পিনারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে অনুপ্রানিত হয়ে দলের পেসাররাও সঠিক লেন্থে বল রেখে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের ঘাম ছুটিয়ে দেন। এক প্রান্ত থেকে উইকেট আঁকড়ে কেদার যাদব খেলে যাওয়ায় ভারতের স্কোর পর্যন্ত ২২৪ রানে পৌছায়। মামুলি এই রান নিয়ে ভারত ম্যাচের চ্যালেঞ্জ জিতলো।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm