আদর্শ সন্তানের গুরুত্ব: ধর্মপরায়ণ হলে শান্তি, অবাধ্য হলে ভাঙে স্বপ্ন

একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষার জায়গায় থাকে নেক ও চরিত্রবান সন্তান লাভের বাসনা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা কন্যা দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র দেন, কখনো উভয়ই দান করেন, আবার কাউকে সন্তানের ব্যাপারে পরীক্ষা করেন। মানবজীবনের এই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা এবং আল্লাহর প্রিয় নবীদের দৃষ্টান্ত। তাঁদের জীবনে যেমন দোয়ার আবেদন ছিল, তেমনি ছিল আদর্শ পরিবারের স্বপ্ন।

নেক সন্তানের জন্য দোয়া

সন্তান লাভ শুধু প্রাপ্তির বিষয় নয়, বরং দায়িত্বেরও শুরু। সন্তান আদর্শবান, চরিত্রবান ও আল্লাহভীরু হলে পরিবারে আসে শান্তি; আর সন্তান অবাধ্য হলে বাবা-মায়ের পরিশ্রম ও স্বপ্ন মাটি হয়ে যায়। কোরআনে নেক সন্তান চাওয়ার দোয়ার অসংখ্য নমুনা রয়েছে। আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম (আ.) আবেদন করেছিলেন, ‘রাব্বি হাবলি মিনাস সলিহিন’—অর্থাৎ তাঁকে এক সৎ সন্তান দান করার প্রার্থনা। আর হজরত জাকারিয়া (আ.) নিঃসন্তান অবস্থায় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছিলেন, ‘রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা জুররিইয়াতান তাইয়িবাহ ইন্নাকা সামিউদ দুআ’—এক পবিত্র সন্তান দানের আশা নিয়ে। উভয় দোয়া কোরআনে সংরক্ষিত, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুসলমানদের সামনে আদর্শ হয়ে আছে।

পিতা-মাতার দায়িত্ব

সন্তান দুনিয়ার শোভা, কিন্তু সুসন্তান পরকালের পাথেয়। মা-বাবার মৃত্যুর পর যেসব দায়িত্ব সন্তানকে পালন করতে হয়—দোয়া করা, মাগফেরাত কামনা, সদকা করা, ঋণ পরিশোধ করা, কবর জিয়ারত করা, তাঁদের রেখে যাওয়া ভালো কাজগুলো সম্পন্ন করা—এসবই ইসলামের শিক্ষা। পবিত্র কোরআনে মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার কেবল তাঁদের জীবদ্দশায় নয়, মৃত্যুর পরও অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তিনটি বিষয় ছাড়া সব আমল বন্ধ হয়ে যায়—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং সেই ধার্মিক সন্তান, যে তার পিতা-মাতার জন্য দোয়া করে। অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেন, পিতা-মাতার দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং অত্যাচারিতের দোয়া নিশ্চিতভাবেই কবুল হয়। তাই ক্ষুব্ধ হয়ে সন্তানের বিরুদ্ধে বদ দোয়া করা নিষিদ্ধ। কারণ মুহূর্তটি যদি কবুল হওয়ার হয়, তবে সেই বদ দোয়া সন্তানের ইহকাল-পরকাল উভয়ই নষ্ট করতে পারে।

সন্তান লালন-পালনে ইসলামের নির্দেশনা

হাদিসে বলা হয়েছে, প্রতিটি শিশু ইসলামের প্রকৃতির ওপর জন্মগ্রহণ করে; এরপর মা-বাবাই তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক করে তোলে। অর্থাৎ সন্তান তার ধর্মীয় চরিত্র গঠনে মা-বাবাই প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে সন্তানকে ভালোবাসা, যত্ন, উত্তম ব্যবহার এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করার।

সন্তানের আচরণে কষ্ট পেলেও বদ দোয়া করা নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন—নিজের বিরুদ্ধে, সন্তানের বিরুদ্ধে, কিংবা সম্পদের বিরুদ্ধে বদ দোয়া করো না; হতে পারে সেই মুহূর্তটি কবুল হওয়ার সময়, আর আল্লাহ তা মঞ্জুর করে ফেলবেন।

নেক সন্তান চাওয়ার কোরআনিক দোয়া

চরিত্রবান, আল্লাহভীরু সন্তান লাভের জন্য কোরআনে একটি দোয়া উল্লেখ আছে, ‘রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিইয়াতিনা কুররাতা আইয়ুন ওয়া জাআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা’—অর্থাৎ, স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে চোখের শীতলতা দান এবং তাকওয়াবানদের নেতা বানানোর প্রার্থনা।

ভ্রান্ত বিশ্বাস ও নিষিদ্ধ প্রথা

আমাদের সমাজে অনেকেই সন্তানচাওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহকে বাদ দিয়ে বিভিন্ন মাজার, দরগাহ বা পীরের কাছে প্রার্থনা করেন, অদ্ভুত নিয়ম-কানুন ও মানত পালন করেন। এসব কাজ ইসলামে দৃঢ়ভাবে নিষিদ্ধ। সন্তান দানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর, আর এ বিষয়ে অন্য কারও ওপর বিশ্বাস রাখা শিরক—যা ভয়াবহ গোনাহ।

মা-বাবার জন্য করণীয়

দান-সাদকাহ করা, নফল রোজা রাখা, হজ–ওমরাহ ও কোরবানি করা, ঋণ পরিশোধ করা, কাফফারা আদায় করা, তাঁদের বন্ধু–পরিজনকে সম্মান জানানো, স্মৃতিকে মর্যাদা দেওয়া, গোনাহের কাজ থাকলে তা বন্ধ করা—এসব কাজ সন্তানের দায়িত্ব হিসেবে ইসলামে স্পষ্টভাবে বলা আছে।

নেক সন্তান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত। তাই সন্তান জন্মের আগে, পরে এবং প্রতিদিনই তাঁর হিদায়াত, সঠিক পথে থাকার তওফিক ও আদর্শ চরিত্র গঠনের জন্য দোয়া করা প্রতিটি মুমিন মা-বাবার কর্তব্য। আল্লাহর দরবারেই রয়েছে দোয়া কবুলের নিশ্চয়তা।

মহান আল্লাহ আমাদের সন্তান লালন-পালনে সতর্কতা, প্রজ্ঞা ও সঠিক পথনির্দেশ দান করুন। আমিন।

লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

ksrm