আইসিইউতে ঢুকলেই অর্ধেকের মৃত্যু, জীবাণুর বিষে নীল চট্টগ্রাম মেডিকেল
৪০% রোগীর শরীরে অকেজো অ্যান্টিবায়োটিক
চট্টগ্রাম নগরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), যেখানে জীবনের শেষ ভরসা নিয়ে প্রতিদিন ভর্তি হন গুরুতর অসুস্থ রোগীরা, সেখানে গত এক বছরে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় অর্ধেকই আর ফিরতে পারেননি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আইসিইউতে ভর্তি ৪ হাজার ৮২০ রোগীর মধ্যে ২ হাজার ৩৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। শতকরা হিসাবে এই হার ৪৯। আইসিইউতে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারানো, দুর্বল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ওষুধ ও সুরক্ষা সামগ্রীর সংকট এবং অব্যবস্থাপনার এই চিত্র উঠে এসেছে হাসপাতালের নথি, চিকিৎসকদের বক্তব্য ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণে।

অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর, সংক্রমণ সর্বত্র
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আইসিইউর দুই ইউনিটে চিকিৎসাধীন প্রায় ৪০ শতাংশ রোগীর শরীরে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। আইসিইউতে নেওয়ার পর প্রতিটি কালচার রিপোর্টেই দেখা যায়, রোগীর শরীরে এমন জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছে, যার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক নেই। চিকিৎসকদের ভাষায়, অধিকাংশ রিপোর্টেই ‘নো সেনসিটিভ, নো ইন্টারমিডিয়েট; এভরিথিং রেজিস্ট্যান্স’ ধরনের ফল আসে। এর পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় নতুন ভর্তি রোগী যেমন দ্রুত সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে থাকা রোগীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।

চিকিৎসকরা জানান, আইসিইউতে থাকা রোগীরা সাধারণত গুরুতর অবস্থায় থাকেন এবং ভেন্টিলেটর, ক্যাথেটার বা সেন্ট্রাল লাইনের মতো ইনভেসিভ ডিভাইস ব্যবহারের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। গুরুতর অসুস্থতার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকলে সংক্রমণের আশঙ্কা আরও বাড়ে। হাসপাতাল-সংক্রমণ বা হসপিটাল অ্যাকোয়ার্ড ইনফেকশন অনেক ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হাতের মাধ্যমে সংক্রমণই এখানে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন চিকিৎসকেরা।

আইসিইউর ভেতরের বাস্তবতা
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. হারুনুর রশিদ বলেন, চিকিৎসক, নার্স কিংবা অ্যাটেনডেন্টদের হাত ঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত না করা সংক্রমণের অন্যতম কারণ। এক রোগীর সংস্পর্শে ব্যবহৃত হাত বা গ্লাভস দিয়ে অন্য রোগী ধরলে জীবাণু দ্রুত ছড়ায়। ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে অনেক সময় রোগীরা ভেন্টিলেটর-অ্যাসোসিয়েটেড নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন প্রস্রাবের নল বা সেন্ট্রাল লাইন ব্যবহারে রক্তে সংক্রমণ ও সেপসিসের ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ফলে এমআরএসএ, অ্যাসিনেটোব্যাক্টার ও সিউডোমোনাসের মতো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার বেড়েছে।

অপরিচ্ছন্ন যন্ত্রপাতি ও পরিবেশও সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অক্সিজেন মাস্ক, সাকশন মেশিন, থার্মোমিটার ও বেড যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত না করলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে। একই ওয়ার্ডে একাধিক রোগী থাকায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।
কারা আসেন আইসিইউতে
আইসিইউ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মতে, এখানে ভর্তি রোগীদের মধ্যে অপারেশন-পরবর্তী জটিল রোগী, নিউরোসার্জারি ও ব্রেন স্ট্রোকের রোগী, বার্ন ইনজুরি আক্রান্ত, ডিকেএ বা ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস, গুইলেন-বারে সিনড্রোম, একলাম্পসিয়া, মায়াসথেনিয়া গ্র্যাভিস, পেশি দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন রোগী আইসিইউতে ভর্তি হন।
ডা. হারুনুর রশিদ বলেন, আইসিইউতে শ্বাসপ্রশ্বাসের সহায়তায় বিভিন্ন পদ্ধতিতে ভেন্টিলেশন দেওয়া হয়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ওষুধ ও কিডনি জটিলতায় ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা থাকে। সংক্রমিত রোগীদের ক্ষেত্রে রিপোর্ট দেখে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে রোগীরা আগে থেকেই অপরিকল্পিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে আসায় অনেক সময় কোনো ওষুধই কার্যকর হয় না।
সুরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতি ও অনিয়ম
চিকিৎসকদের মতে, সংক্রমণ কমাতে আইসিইউ পুরোপুরি বন্ধ এলাকা হওয়ার কথা, দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত জনবল, ভেতরে ওষুধ সংরক্ষণ, হ্যান্ডওয়াশ ও পিপিই ব্যবহারের নিয়ম মানা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়মগুলোর কোনোটিই দুই ইউনিটে কার্যকর নেই। রোগীপ্রতি একটি করে পিপিই দেওয়া হলেও সেটি রোগী যতদিন ভর্তি থাকে, ততদিন একইভাবে ব্যবহার করেন স্বজনরা। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি পিপিই না পেয়ে বাইরে থেকে কিনতে হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আইসিইউর ভেতরে অবাধে রোগীর স্বজনদের আসা-যাওয়া চলছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক নার্স, ওয়ার্ড বয় ও আউটসোর্সিং কর্মচারীদের পিপিই ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ওয়ার্ড বয় ও আউটসোর্সিং কর্মচারীরা নার্সের কাজ করে স্যালাইন লাগানো ও ভেন্টিলেটর অপারেট করছেন এবং রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে বকশিসের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন।
ইউনিট ওয়ানের স্টাফ নার্স ইনচার্জ অপর্ণা রানী ও ইউনিট টুর স্টাফ নার্স ইনচার্জ রিংকু দেওয়ানজি বলেন, সারাদিন কাজের চাপে পিপিই পরার সময় মেলে না, যদিও পিপিই ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। ওয়ার্ডের বাইরে জুতা রাখার নিয়ম থাকলেও অনেকেই তা মানেন না।
রোগীর স্বজনদের দুর্ভোগ
হাসপাতালের চারতলার আইসিইউর সামনের বারান্দা ও ইউনিট টুর সামনে স্বজনদের ভিড় লেগেই থাকে। পিপিই কাপড়ের সঙ্গে রেখে দেওয়া, বারান্দায় খাওয়া-দাওয়া ও বিছানাপত্র নিয়ে অবস্থান করার চিত্রও দেখা গেছে। সরকারি হাসপাতাল হলেও আইসিইউতে প্রায় সব ওষুধ রোগীর স্বজনদের কিনে দিতে হয়। তরল দুধ সরবরাহ থাকলেও বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ আছে।
আইসিইউ ইউনিট টুতে চিকিৎসাধীন নুরুর কবিরের ছেলে কাইয়ুম বলেন, বাবাকে ভর্তি করানোর পাঁচ দিনে প্রায় ২০ হাজার টাকার ওষুধ ও ইনজেকশন কিনতে হয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হওয়ায় চিকিৎসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
হাসপাতালের স্টোর সূত্রে জানা গেছে, পর্যাপ্ত ওষুধ ও ইনজেকশন সরবরাহ থাকলেও রোগীরা সেগুলো পান না। আইসিইউতে ভর্তি করাতে প্রাথমিকভাবে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতে হয়। এরপর একের পর এক অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে গিয়ে স্বজনদের নাভিশ্বাস উঠে।
মৃত্যুর পরিসংখ্যানে বছর পার
গত ২০২৫ সালের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে মৃত্যুর এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। ইউনিট ওয়ানে গত জানুয়ারিতে ৭২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৫৫ জন, মার্চে ৭০ জন, এপ্রিলে ৭০ জন, মে মাসে ৮০ জন, জুনে ৬৫ জন এবং জুলাইয়ে ৭৭ জন মারা যান। পরবর্তী মাসগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত ছিল—আগস্টে ৭১ জন, সেপ্টেম্বরে ৮৯ জন, অক্টোবরে ৮০ জন, নভেম্বরে ৯৬ জন এবং ডিসেম্বরে ৬৯ জন রোগী মারা গেছেন। অন্যদিকে ইউনিট টু-তে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল আরও বেশি। গত জানুয়ারিতে ১১৪ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১০৯ জন, মার্চে ১৩৩ জন, এপ্রিলে ১৪০ জন, মে মাসে ১৫০ জন, জুনে ১২২ জন, জুলাইয়ে ১০৭ জন, আগস্টে ৯০ জন, সেপ্টেম্বরে ১২৩ জন, অক্টোবরে ১৩৭ জন, নভেম্বরে ১১৭ জন এবং ডিসেম্বরে ১১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
সহযোগী অধ্যাপক নুরুল আজিম এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সংক্রমণ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার কারণে চিকিৎসকদের সব চেষ্টাই অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে যায়। তার মতে, রোগীদের বাঁচাতে হলে আইসিইউকে শতভাগ সুরক্ষিত করতে হবে এবং সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে।
নষ্ট যন্ত্রপাতির স্তূপ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আইসিইউ নষ্ট ও অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির স্তূপে পরিণত হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮২ লাখ ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা, ২০২২-২৩ এ ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ২০২৩-২৪ এ ৯৫ লাখ ৯৭ হাজার টাকা এবং ২০২৪-২৫ এ ৯২ লাখ টাকার যন্ত্র কেনা হলেও অনেক যন্ত্র অল্প সময়েই অকেজো হয়ে পড়েছে। অব্যবহৃত সচল যন্ত্রপাতি বারান্দায় ফেলে রাখা হয়েছে।
ব্লাড গ্যাস অ্যানালাইজার, মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর ও এলইডি ওটি লাইটসহ দামী যন্ত্র কিনেও সেগুলোর সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক থাকলে প্রতিবছর নতুন যন্ত্র কেনার প্রয়োজন হতো না এবং সরকারি অর্থ সাশ্রয় হতো।
এ বিষয়ে বিভাগীয় প্রধান ডা. হারুনুর রশিদ জানান, যন্ত্রপাতি কেনার বিষয়টি হাসপাতাল পরিচালক অবগত, এ নিয়ে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার এখতিয়ার নেই।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দীন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, আইসিইউতে যে নষ্ট যন্ত্রপাতি রয়েছে তা মেরামতের জন্য টেন্ডার দেয়া হবে। খুব শীঘ্রই এ টেন্ডার কাজ সম্পাদন করা হবে।
সিপি




