ভালোবাসার বন্ধন মুহূর্তেই ছিন্ন/ চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রতিদিন ভাঙছে শত সংসার

0

চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রতিদিনই শতাধিক সংসার বিলীন হয়ে যাচ্ছে বিচ্ছেদের গর্ভে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য, পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক নানা অভিঘাতের ফলে মুহূর্তেই ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে ভালোবাসার বন্ধন। শিক্ষিত-অশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত সব শ্রেণীর মধ্যেই ডিভোর্সের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এ তথ্য।

প্রতিবেদন মতে, ৯০ দিন অতিক্রান্ত সূত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে আড়াইশো। বেশিরভাগ দম্পতিই বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েই মামলায় আসেন। এর মধ্যে ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রেই বিবাহ-বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে যায়। চট্টগ্রাম মহানগরীতে গড়ে মাত্র ২ শতাংশ দম্পতি আপসে যায়। অন্যদিকে ঢাকা মহানগরীতে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলায় আপোস হচ্ছে গড়ে ৫ শতাংশেরও কম। যদিও দেশের সবচেয়ে বেশি বিবাহ-বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে ঢাকা মহানগরীতে। ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় তালাক হয় একটি করে।

ভালোবাসা যেখানে পরাজিত
নোয়াখালীর দম্পতি নিজাম উদ্দিন ও শারমিন আকতার সুমির কর্মসূত্রে চট্টগ্রামে বসবাস। ভালোবেসে দুই পরিবারে সম্মতিতে ইউপি চেয়ারম্যান বাবার ছেলে নিজাম ও সুমির বিয়ে হয়। বছর ঘুরতেই ঘর আলো করে আসে একটি পুত্রসন্তান। সুখে শান্তিতেই কাটছিল তাদের বিবাহিত জীবন। কিন্তু হঠাৎ পরকীয়ার জালে পড়ে তাদের দাম্পত্য জীবনে নেমে আসে অন্ধকার।

ইংলিশে অনার্স ও মাস্টার্স পাস সুমি বলেন, ‘আমি নিজামকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। তাও ফেরাতে পারিনি। কারণ আমার শাশুড়ি বিস্ময়করভাবে তার পক্ষে ছিল পরকীয়ার ব্যাপারে। এসব দেখে আমি মনে করেছিলাম আরেকটি সন্তান নিলে মনে হয় সে ফিরে আসবে পরকীয়া থেকে। কিন্তু আমার একটি মেয়েশিশু হওয়ার পরও তার কোনো পরিবর্তন দেখিনি। শেষে উপায়হীন হয়ে ছেলেমেয়েকে নিয়ে পাঁচ বছরের সংসারের ইতি টেনে চলে আসতে হলো এই ভেবে—আমার ভালোবাসা পরকীয়ার কাছে পরাজিত।

দাম্পত্য জীবনে যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকার কথা—সেটা এখন আর কাজ করছে না। প্রতীকী ছবি।
দাম্পত্য জীবনে যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকার কথা—সেটা এখন আর কাজ করছে না। প্রতীকী ছবি।

বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ার কারণ কী?
বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে গবেষণা করছে এমন সংস্থার পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টগ্রামে প্রতিদিন যে হারে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক। এতে দেখা যায়, মাদক ও মোবাইল ফোনে আসক্তি, মূল্যবোধের অবক্ষয়সহ বিভিন্ন কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে মেয়েরাও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পর একক সিদ্ধান্তে বিবাহ বিচ্ছেদের পথ বেছে নিচ্ছে।

বিবাহ বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বনিবনা না হওয়া’। স্ত্রীর করা আবেদনে বিবাহ বিচ্ছেদের সপক্ষে যেসব কারণ দেখানো হয়, তার মধ্যে রয়েছে স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক, যৌতুক, দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে না আসা, মাদকাসক্তি, ফেসবুকে আসক্তি, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত, নৈতিকতাসহ আরও বিভিন্ন কারণ। অন্যদিকে স্বামীর আবেদনে বিবাহ বিচ্ছেদের সপক্ষে দেখানো হয় অবাধ্য হওয়া, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী না চলা, বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সন্তান না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাম্পত্য জীবনে যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকার কথা—সেটা এখন আর কাজ করছে না। যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবারে এসে ‘স্বাধীন’ হতে গিয়ে স্বাধীনতার অপব্যবহার হচ্ছে বেশি।

নানাজনের নানা মত
স্কুলশিক্ষিকা শারমিন ইসলামের মতে, ‘মূলত পারিবারিক ব্যবস্থার বিলুপ্তি, একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন, প্রযুক্তির অপব্যবহার, পারিবারিক বিনোদনের অভাব, শহরের যান্ত্রিক জীবনব্যবস্থা, পরস্পরের প্রতি সম্মান ও বিশ্বাসের অভাব, প্রযুক্তির কল্যাণে ভিন্ন নারীতে আসক্তি, খাদ্যের গুণগতমানের অভাবে মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হওয়া এবং অতিমাত্রায় কৃত্রিমতাই মূলত বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ।’

মাদ্রাসাশিক্ষক গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘বিবাহের মত পবিত্র সম্পর্কে ছেদ ঘটছে তার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?’ তার মতে, মূলত উচ্চশিক্ষা, আর্থিকভাবে স্বনির্ভরতা ও অধিকারসচেতনতায় নারীরা জেদী হয়ে উঠছে। এই জেদই সংসার ভাঙ্গার মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করে।

সব শ্রেণীর মধ্যেই ডিভোর্সের প্রবণতা
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ) জাহানারা ফেরদৌস বলেন, ‘আসলে আমাদের কাছে যখন দম্পতিরা আসে, তারা বিবাহ-বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েই আসে। তো সেই অবস্থায় তাদেরকে ফেরানো খুব কষ্টকর হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রেই বিবাহ-বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে যায়। শুধুমাত্র ২ শতাংশ দম্পতি আপসে যায়।’

তিনি বলেন, ‘মূলত ডিভোর্স হয়ে থাকে মাদকদ্রব্য সেবন, ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে পরকীয়া, পারিবারিক কলহসহ আরও কিছু কারণে।’ চটগ্রাম নগরীতে শিক্ষিত-অশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত সব শ্রেণীর মধ্যেই ডিভোর্সের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জাহানারা ফেরদৌস বলেন, ‘আমি তরুণ সমাজকে বলতে চাই বিয়ে মানে শুধু অবাধ দৈহিক মিলন নয়। বিয়ে হচ্ছে একটি সামাজিক ইনস্টিটিউশন। বিয়ের সংজ্ঞাটাই হচ্ছে সামাজিক স্থাপনা—যা সুন্দর ভবিষ্যত নিশ্চিত করে। ধর্মীয় বা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত সেই স্থাপনা পরিপক্ক না হবে, ততোক্ষণ সমাজে বিয়ে রয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্ক ভাঙতে থাকবে।’

Loading...
আরও পড়ুন