আইনের ফাঁক/ ক্যাসিনো অবৈধ, কিন্তু সরঞ্জাম আমদানি বৈধ!

ক্যাসিনোর চিপ আসে জুতাশিল্পের কাঁচামাল দেখিয়ে

দেশে ক্যাসিনো অবৈধ, কিন্তু বিস্ময়করভাবে ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানিতে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই শুল্ক আইনে। নিষেধাজ্ঞা না থাকার এই ফাঁককে পুঁজি করে বছরের পর বছর ধরে বাধাহীনভাবে চলছে ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি। সরকারও এ থেকে কর পেয়ে আসছে।

আমদানি নীতির দুর্বলতায় ক্যাসিনোতে ব্যবহৃত চিপ, কয়েন ও টেবিল সহজেই ঢুকছে দেশে। কারণ আমদানির বাণিজ্যিক ঘোষণায় এগুলোকে দেখানো হয় জুতো, বিনোদন এবং ক্রীড়াপণ্য সম্পর্কিত সরঞ্জাম হিসাবে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের (সিআইআইডি) এক তদন্তে এ ধরনের বেশকিছু ঘটনা বেরিয়ে এসেছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠানকে ইতিমধ্যে চিহ্নিত করেছে, যারা ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানির সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়ে অধিকতর তদন্ত চলছে বর্তমানে। কাস্টমস এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অবৈধ ক্যাসিনো সরঞ্জাম আইনি উপায়ে আমদানির ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের তথ্য অনুসারে, ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর এএম ইসলাম অ্যান্ড সন্স লিমিটেড চীন থেকে ৭০টি ক্যাসিনো চিপ আমদানি করে। প্রতিষ্ঠানটি সাউথইস্ট ব্যাংকে ৮ দশমিক ৮৮ লাখ টাকার ঋণপত্র খুলে সরঞ্জামগুলো বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এই আমদানির বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমস শুল্ক, পরিপূরক শুল্ক এবং মূল্য সংযোজন কর হিসাবে মাত্র ৪ হাজার ১৮৮ টাকা এনবিআরকে পরিশোধ করে।

আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই প্রতিষ্ঠানটি এইচএস কোড ৬৪০৬৯০০ ব্যবহার করে বাণিজ্যিক ঘোষণা ছাড়াই ক্যাসিনো চিপগুলো আমদানি করেছে। পণ্যের বিবরণে চিপগুলোকে দেখানো হয়েছে পাদুকা শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে। এইচএস বা হারমোনাইজড সিস্টেম হচ্ছে পণ্যকে শ্রেণীবিন্যাস করার একটি আন্তর্জাতিক মান ব্যবস্থা।

এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্ত ঢাকা ও গাজীপুরভিত্তিক এক সিএন্ডএফ এজেন্ট কাওসার কার্গো কমপ্লেক্স লিমিটেডের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নির্দিষ্ট কোনো এইচএস কোড না পাওয়ায় তারা পাদুকা শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে দেখিয়ে ক্যাসিনো চিপগুলো আমদানি করেছেন।

ঢাকা কাস্টম হাউজের কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেছেন, ‘প্রচলিত আইনে ক্যাসিনো সরঞ্জামের মতো পণ্যের সরাসরি কোনো বিবরণ নেই, তাই সম্পর্কিত পণ্য হিসেবে দেখিয়ে এর আমদানির অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। তবে পণ্যের ঘোষণায় মিথ্যা তথ্য দিয়ে যারা ক্যাসিনো চিপ আমদানি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অন্যদিকে চট্টগ্রামের কাস্টম কর্মকর্তাদের মতে, ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে মূলত এইচএস কোড ৯৫০৪.৫০.০০ (ভিডিও গেমস কনসোল এবং মেশিন, উপশিরোনাম ৯৫০৪.৩০ ছাড়া অন্যান্য) ব্যবহার করে। তাদের হিসেবে গত ৫ বছরে মোট ৫১ টন ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে। এ থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৬৩ লাখ টাকা।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনার ফখরুল আলম বলেছেন, ‘সরকারি আমদানি নীতিমালা অনুসারে ক্যাসিনো পণ্য আমদানিতে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান এইচএস কোড অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করা হয়। নীতি অনুযায়ী শুল্কও পরিশোধ করা হয়। আর আমদানি নীতিমালা তৈরি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এটা আমরা তৈরি করিনি।’

কাস্টম কমিশনার ফখরুল আলম আরও বলেন, ‘(ক্যাসিনোর) একই সরঞ্জাম আপনি বিনোদন পার্ক ও ক্লাব—এ দুই জায়গাতেই দেখতে পাবেন। যেহেতু কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, তাই আমাদের একমাত্র দায়িত্ব হল কর আদায় সঠিকভাবে করা হচ্ছে কিনা সেটা যাচাই করা।’

এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, ‘ক্যাসিনো ব্যবসা বাংলাদেশে সম্পূর্ণ অবৈধ। এনবিআর ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানিতে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেলে এনবিআর তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে।’

এইচএস কোডের ধাঁধা: কাস্টমসের বরাতেই যতো সুযোগ
এইচএস কোডের ৯৫ অধ্যায়ে খেলনা, গেমস এবং প্রয়োজনীয় ক্রীড়াসামগ্রী এবং তাদের অংশ ও আনুষাঙ্গিক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে এইচএস কোড ৯৫০৪ শিরোনামে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে ‘ফানফেয়ার এবং নির্দিষ্ট করে পিনটেবলস, বিলবোর্ড এবং ক্যাসিনো গেমের বিশেষ টেবিলসহ টেবিল বা পার্লার গেম।’

দেখা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিশ্লেষণ করা চার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিল অফ এন্ট্রি অনুযায়ী নিনাদ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠান আমদানি করেছে ‘ক্যাসিনো কয়েন’ এবং পুস্পিতা এন্টারপ্রাইজ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান এনেছে ক্যাসিনো ওয়ার গেইম টেবিল, পোকার খেলার চিপ, রুলেট গেম টেবিল—এই সবকিছুই রাখা হয়েছে ৯৫০৪ শিরোনামের এইচএস কোডের অধীনে। তবে এনবিআর ডকুমেন্টে পণ্যের বিবরণে এইচএস কোড শিরোনামের ‘পিন টেবিল, বিলবোর্ড এবং ক্যাসিনো গেমের বিশেষ টেবিলসহ’—এই অংশটি বাদ দেওয়া হয়।

দেখা গেছে, এথ্রি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান ক্যাসিনোতে ব্যবহৃত রুলেট গেইম আমদানি করেছে ৯৫০৫ শিরোনামের এইচএস কোডের অধীনে, যা মূলত উৎসব, কার্নিভাল ও বিনোদন পণ্যের জন্য নির্দিষ্ট।

এই এইচএস কোডগুলো কাস্টমস ন্যাশনাল ট্যারিফের পণ্যতালিকায় দেখা যায় না। কাস্টমসের অনলাইন শুল্ক ক্যালকুলেটরেও এইচএস কোডের এই শিরোনামগুলো কোনো ফলাফল দেখায় না। তবে ‘মুদ্রা, ব্যাংক নোট, ব্যাংক কার্ড, টোকেন বা অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন গেম’-এর জন্য ছয় অংকের এইচএস কোড ৯৫০৪৩০ রাখা আছে।
এই কোডের অধীনে আমদানি করা পণ্যে ৬০.৩১ শতাংশ কর আসে। এর অর্থ হল, এই এইচএস কোডের অধীনে নির্দিষ্ট হারে শুল্ক পরিশোধ করে অনায়াসে পণ্য আমদানি করা যায়।

এনবিআর থেকে পাওয়া এক ডকুমেন্টে দেখা গেছে, এএম ইসলাম অ্যান্ড সন্স লিমিটেড ৬৪০৬ শিরোনামের এইচএস কোডের অধীনে ‘পাদুকা শিল্পের সরঞ্জাম’ ঘোষণা দিয়ে আমদানি করেছে ‘ক্যাসিনো চিপ’।

ভুয়া ঠিকানায় ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি
আইসিটি পণ্য ও খেলনা আমদানিকারক দুটি প্রতিষ্ঠান—ইউনাইটেড এবিসি ইন্টারন্যাশনাল বিডি লিমিটেড এবং গোল্ডেন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল বিডি ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে ক্যাসিনো ও জুয়ার সরঞ্জাম আমদানি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের জুন ও সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানগুলো দুটি চালানে ক্যাসিনো ও জুয়ার সরঞ্জাম এনেছে দেশে।

এ প্রসঙ্গে ইউনাইটেড এবিসি ইন্টারন্যাশনাল বিডি লিমিটেডের পরিচালক মো. বাহারুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে ক্যাসিনো ও জুয়ার সরঞ্জাম আমদানির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠান সবসময় চীন থেকে কেবল খেলনাসামগ্রীই আমদানি করে থাকে। কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে পাওয়া একটি ডকুমেন্টে ৯৫০৪.৩০.০০ নম্বরের একটি চালানে জুয়ার সরঞ্জাম আসার তথ্য মিলেছে।

আমদানির সময় কেন তারা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে ভুয়া ঠিকানা উল্লেখ করেছিল জানতে চাইলে ইউনাইটেড এবিসি ইন্টারন্যাশনালের ওই পরিচালক বলেন, গুলশানের ওই ভবনে তাদের একটি অফিস রয়েছে। তবে তিনি এর কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

অন্যদিকে গোল্ডেন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল বিডির প্রোডাক্ট ম্যানেজার সোহরাব হোসেন স্বীকার করেছেন, কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া ঠিকানা আগে তাদের ছিল। ওই ঠিকানা এখনও আছে কিনা—এ প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান তিনি। তবে ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানির অভিযোগ অস্বীকার করে সোহরাব বলেন, ‘আমরা সাধারণত বিদেশ থেকে আইসিটি এবং ঘরোয়া সরঞ্জাম আমদানি করি। আমরা আমাদের শো-রুমগুলোতে সেগুলোই বিক্রি করি। ক্যাসিনো সরঞ্জাম চালান আমদানির বিষয়ে আমদানি তালিকা এবং চালানগুলো পরীক্ষা করে দেখতে হবে আমাদের।’

ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক নজরুল ইসলাম হেলালীর সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি।

মূল উৎস: দি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে আব্বাস উদ্দিন নয়ন, শামসুদ্দিন ইলিয়াস ও জিয়া চৌধুরীর প্রতিবেদন অবলম্বনে

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!