অ্যাডিলেডে ওয়ার্নারের ট্রিপল সেঞ্চুরির ম্যাচে রেকর্ডের ছড়াছড়ি

টেস্টে দ্রুততম সাত হাজার রান স্মিথের

0

বাউন্ডারি মেরে ডেভিড ওয়ার্নার ট্রিপল সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ করার পরই ধারাভাষ্যকাররা বলাবলি শুরু করে দিয়েছিলেন, ওয়ার্নারকে এবার ৪০০ রান করার সুযোগ করে দেবেন তো অধিনায়ক টিম পেইন নাকি ইনিংস ঘোষণা করে দেবেন? যেভাবে ব্যাটিং করে যাচ্ছিলেন ডেভিড ওয়ার্নার, তাতে ব্রায়ান লারার করা ৪০০ রানের রেকর্ড অতিক্রম করতেও হয়তো পারতেন তিনি। হাতে সময়ও ছিল অনেক। খেলার বয়স মাত্র দ্বিতীয় দিন কিন্তু ওয়ার্নারের সামনে ইতিহাস গড়ার যে সুযোগ হাতছানি দিচ্ছিল, সেটাকে শেষ করে দিলেন অসি অধিনায়ক টিম পেইন। অবশ্য পাকিস্তানি বোলার ফিল্ডাররা পেইনকে ধন্যবাদ জানাতে পারে তার দলের ব্যাটসম্যানদের দেয়া পেইন থেকে রক্ষা করায়।

কিংবদন্তি ডন ব্র্যাডম্যানকে টপকে গিয়ে ওয়ার্নার অ্যাডিলেড ওভালে গোলাপি বলের টেস্টে এদিন তিনশো রানের গণ্ডি ছুঁলেন। এই ট্রিপল সেঞ্চুরিতে অনেকগুলো রেকর্ড গড়েছেন ওয়ার্নার। ব্র্যাডম্যানকে কোথায় পেছনে ফেললেন ওয়ার্নার? অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ওভালে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান এর আগে সর্বোচ্চ ২৯৯* রানের ইনিংস খেলেছিলেন। এটাই এই মাঠে কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ রান। ১৯৩২ সালে সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ব্র্যাডম্যান এই রান হাঁকিয়েছিলেন। সেই কীর্তি এদিন টপকে গেলেন ওয়ার্নার।

এদিন ওয়ার্নার ৩০০ রান ছুঁতেই গ্যালারি হাততালিতে ফেটে পরে। সেই সঙ্গে এদিন মাথা নিচু করে স্পেশাল সেলিব্রেশনে ব্র্যাডম্যানকে শ্রদ্ধা জানান তিনি। ৫১৯ মিনিট ক্রিজে থেকে ৩৮৯ বল খেলে ৩৭টি চার হাঁকিয়ে ওয়ার্নার ৩০০ রানে পৌঁছন। ওয়ার্নারের কীর্তিতে চোখে জল তার স্ত্রীর। কারণ শেষ এক বছরটা ওয়ার্নারকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। সাউথ আফ্রিকার বিরুদ্ধে কেপটাউন টেস্টে বল বিকৃতি কেলেঙ্কারিতে জড়ানোর পর ক্রিকেট থেকে এক বছরের জন্য নির্বাসিত হয়েছিলেন। এরপর দেশের জার্সি গায়ে চাপিয়ে প্রত্যাবর্তন। বিশ্বকাপ ও সীমিত ওভারে রান পেলেও অ্যাশেজ সিরিজে রান পাননি।

তবে ঘরের মাঠে ব্রিসবেন টেস্টে সেঞ্চুরির পর ওভালে তিনশো হাঁকালেন ওয়ার্নার। সেই কীর্তি দেখে গ্যালারিতে রোদচমশার আড়ালে ওয়ার্নারের স্ত্রী ক্যান্ডিস কেঁদে ফেলেন। এদিন টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে চতুর্থ দ্রুততম হিসেবে ওয়ার্নার ত্রিশতরান হাঁকান। এর আগে ভারতের বীরেন্দ্র শেবাগ ২৭৮ বলে তিনশো করেছেন। ম্যাথু হেডেন ৩৬২ বলে ও শেবাগ ৩৬৪ বলে তিনশো করেন। এদিন ৩৮৯ বল খেলে তিনশো রানে পৌঁছান ওয়ার্নার।

ডন ব্র্যাডম্যানের আরও একটি রেকর্ড ভাঙেন ওয়ার্নার। টেস্টে অজি কিংবদন্তি ডন ব্র্যাডম্যান সর্বোচ্চ ৩৩৪ রান হাঁকিয়েছিলেন। এদিন সেই কীর্তিও টপকে গেলেন ওয়ার্নার। অস্ট্রেলিয়ার আরেক ক্রিকেটার মার্ক টেলরও টেস্টে সর্বোচ্চ ৩৩৪ রান হাঁকিয়েছিলেন। তাকেও এদিন টপকে গেলেন ওয়ার্নার। অপরাজিত ৩৩৫ অজিদের হয়ে টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের মালিক হলেন ওয়ার্নার। এদিন ব্র্যাডম্যান ও মার্ক টেলরের ৩৩৪ রান টপকে গিয়ে এই কীর্তি করলেন। অজিদের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ ৩৮০ রান হাঁকানোর কীর্তি রয়েছে ম্যাথু হেডেনের।

রেকর্ড গড়ার পর আনন্দ ভাগাভাগি করছেন ওয়ার্নার ও স্মিথ।
রেকর্ড গড়ার পর আনন্দ ভাগাভাগি করছেন ওয়ার্নার ও স্মিথ।

শেষ পর্যন্ত ৪১৮ বলে ৩৯টি চার ও একটি ছয় মারেন ওয়ার্নার। অস্ট্রেলিয়ার সপ্তম ব্যাটসম্যান হিসেবে ট্রিপল সেঞ্চুরি করলেন ওয়ার্নার। অজিদের হয়ে সবশেষ তিনশো রান করেছিলেন মাইকেল ক্লার্ক, ২০১২ সালে। পাকিস্তানের বিপক্ষে চতুর্থ কোনো ব্যাটসম্যান হিসেবে ট্রিপল সেঞ্চুরি ওয়ার্নারের। সবশেষ ২০০৪ সালে মুলতানে করেছিলেন শেবাগ। তার অপরাজিত ৩৩৫ রান টেস্টে ক্রিকেটে দশম সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।

দিন-রাতের টেস্টে এটি দ্বিতীয় ট্রিপল সেঞ্চুরি। ২০১৬তে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ৩০২ রানের ইনিংস খেলেছিলেন এই টেস্টে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দেয়া আজহার আলি। ওয়ার্নারের আগে সবশেষ অপরাজিত ট্রিপল সেঞ্চুরি দেখা যায় ২০১৬তে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চেন্নাইতে করেছিলেন ভারতের করুন নায়ার।

২৫০ বা তার বেশি রানের একাধিক ইনিংস খেলা অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় ব্যাটসম্যান ওয়ার্নার। এর আগে ব্র্যাডম্যান পাঁচটি ও মাইকেল ক্লার্ক দুইবার ২৫০ বা তার বেশি রানের ইনিংস খেলেন। ওপেনারদের মধ্যে ওয়ার্নার ছাড়া কেবল শেবাগই এই কাজ করতে পেরেছেন, চারবার। ২৫০ বা তার বেশি রানের ইনিংস খেলা অন্য ওপেনারদের মধ্যে আছেন সনাৎ জয়সুরিয়া, সাউথ আফ্রিকা স্মিথ, ক্রিস গেইল এবং অ্যালিস্টার কুক।

ওয়ার্নার-লাবুশেনের ৩৬১ রানের জুটি দ্বিতীয় উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি। আর যেকোনো উইকেটে যেকোনো দলের এটি অষ্টম সর্বোচ্চ জুটি। তিনি যখন ব্রায়ান লারার চারশো রানের দিকে এগোচ্ছিলেন তখনই ইনিংস ঘোষণা করে অস্ট্রেলিয়া। ৩ উইকেটে ৫৮৯ রানের সময় মাঠ থেকে দুই ব্যাটসম্যানকে ডেকে নেন অধিনায়ক টিম পেইন।

বৃষ্টিবিঘ্নিত দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনের শেষে অজি দল তুলে ৩০২-১। ওয়ার্নার ১৬৬ ও লাবুশেন ১২৬ রানে ক্রিজে ছিলেন। লাবুশেন এদিন আউট হন ১৬২ রান করে। তার আগে অবশ্য চলতি বছর টেস্টে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়ে যান তিনি। ৩৬ রান করে আউট হন স্টিভেন স্মিথ। হাফসেঞ্চুরি না পেলেও একটি রেকর্ড গড়েছেন তিনি। সবচেয়ে কম ম্যাচে টেস্টে ৭ হাজার রান পূর্ণ করেছেন স্মিথ। ১২৬ ইনিংসে এই মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। আগের রেকর্ড ১৩১ ইনিংসে, ওয়ালি হ্যামন্ডেসের। অস্ট্রেলিয়ার আউট হওয়া তিনটি উইকেই নেন পাকিস্তানের শাহীন শাহ আফ্রিদি।

ব্রিসবেনে প্রথম টেস্টে ওয়ার্নার ও লাবুশেনের জোড়া সেঞ্চুরি ইনিংসে জয় এনে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে। অ্যাডিলেডে গোলাপি টেস্টও কি তেমনই হবে? অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস শেষে তেমন গন্ধই পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, ইনিংসের শুরুতে তিন রানের মাথায় প্রথম উইকেট হারিয়ে বসেছে পাকিস্তান।

টানা দুদিন বলের পেছনে ছুটাছুটি করতে করতে ক্লান্ত পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা ৯৬ রান তুলতেই হারিয়ে ফেলে ছয়জন ব্যাটসম্যানকে। আগের টেস্টে সেঞ্চুরি পাওয়া বাবর আজম ৪৩ রান করে একপ্রান্ত আগলে না রাখলে হয়তো দ্বিতীয় দিনেই অলআউটের লজ্জায় পড়তো পাকিস্তান।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

আরও পড়ুন