অবহেলার বলি হয়ে ডাক্তাররা করোনার ঝুঁকিতে, চট্টগ্রামেই আক্রান্ত ৮

১৫ ভাগ স্বাস্থ্যকর্মীই করোনার কোপে

0

নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এ সাধারণ রোগীর পাশাপাশি সংক্রমিত হচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। ইতিমধ্যে সারা দেশে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া চিকিৎসকের সংখ্যা ২০৬ জনে পৌঁছেছে। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী মিলে এ সংখ্যাটা তিন শতাধিক বলে জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন (বিডিএফ)। সংক্রমিত হওয়া দুই শতাধিক চিকিৎসকের মধ্যে চট্টগ্রামেই রয়েছেন আট জন। এর মধ্যে সাতজন সরকারি হাসপাতালের এবং একজন বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক।

সারা দেশে করোনায় আক্রান্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে ১৩ শতাংশ চিকিৎসক। এছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী মিলে শতকরা হিসাবে এ হার দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশেরও বেশি। যা সারা বিশ্বের সর্বোচ্চ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। অথচ আক্রান্ত বেশি হওয়া দেশের মধ্যে ইতালিতে এই হার ৮.৭ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১১ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বিডিএফের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র ডা. নিরুপম দাশ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘সারা বিশ্বে ডাক্তারদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। এরকমভাবে যদি আক্রান্ত হতে থাকে আলটিমেটলি স্বাস্থ্যখাতের ওপর বিরাট প্রভাব পড়বে। জুনিয়ররা চিকিৎসা দিতে ভয় পাবে। সিনিয়ররা রোগীকে দেখতে সন্দেহ পোষণ করবে। এরকম চলতে থাকলে ১৫-২০ দিনের ভেতর পুরো হেলথ সেক্টর কলাপ্স করবে। যদি এখন ডাক্তারদের মধ্যে আরও পরীক্ষা করানো হয় আমার মনে হয় আরও সংক্রমিত ডাক্তার পাওয়া যাবে।’

এতো বেশি ডাক্তার কিভাবে সংক্রমিত হতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ ডাক্তার কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের শিকার হয়েছে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে কারও উপসর্গ ছিল, কারও উপসর্গ ছিল না। কারণ হিসেবে এক নম্বর ফলস পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট)। দুই নম্বর কমিউনিটি ট্রান্সমিশন এবং তিন নম্বর রোগীরা তাদের হিস্ট্রি লুকিয়ে সেবা নিচ্ছে। সেক্ষেত্রে ডাক্তার বুঝতেও পারে না রোগীটি আসলে কোভিড-১৯ বাহক কিনা।’

ডা. নিরুপম দাশ বলেন, ‘সরকার পিপিই সরবরাহ অবশ্যই করেছে। কোয়ালিটি পিপিই সরবরাহ করে নাই। হু (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) রিকোয়ারমেন্ট কোয়ালিটিসম্পন্ন পিপিই কিন্তু আমরা পাইনি। চট্টগ্রামের দেখেন কয়টা হাসপাতালে ডাক্তারেরা পিপিই পরে চিকিৎসা দিচ্ছে। প্রতিদিন আড়াই হাজার বা তিন হাজার টাকা কেউ কি নষ্ট করবে? এগুলোর কতগুলো ব্যাপার আছে।’

এর সাথে যোগ করে তিনি আরও বলেন, ‘এখন কিছু কিছু প্রস্তাবনা দিচ্ছে যেগুলো ভালো লাগছে। এর মধ্যে রয়েছে সব চিকিৎসককে একসাথে এক্সপোজ না করা। যেমন ধরেন, চিকিৎসকদের পাঁচ ভাগে ভাগ করে তারপর একটা টিম কাজ করছে। বাকি চারটি টিম রেস্ট করবে। যদি কোনো টিম ইফেক্টেড হয় তাহলে অন্য রোগীদের চিকিৎসা সেবার ব্যাঘাত ঘটবে না। এভাবে বাকি টিম কাজ করবে। তবে এখন পিপিইর কোয়ালিটি বাড়ছে। এর বাইরে ডাক্তারদের আরও সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।’

একই প্রসঙ্গে বিএমএ চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘এটা অবশ্যই অ্যালার্মিং। বেশিরভাগ রোগী তথ্য গোপন করছে। অনেক রোগীর কোনো উপসর্গ থাকে না, কিন্তু সে বাহক। তার মাধ্যমে আরেকজন সংক্রমিত হয়ে ঝুঁকিতে পড়ছে। আরেকটি হচ্ছে প্রথম দিকে যে সমস্ত নিম্নমানের পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে, গগলসের নামে খেলনা চশমা সরবরাহ করেছে। এখনও পর্যন্ত কাঙ্খিত যেটা কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য সেই এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করে নাই। তাছাড়া এখন তো কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে গেছে। কে ক্যারিয়ার (বাহক) আর কে ক্যারিয়ার না তা বোঝা যাচ্ছে না। এখন যারা চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত তাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। তাছাড়া চিকিৎসকদের উন্নতমানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম দিতে হবে। তা না হলে কিন্তু পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন যে হারে সংক্রমিত হচ্ছে আর ১৫ দিন পরে তো চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য কোন ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী পাওয়া যাবে না। সরকার যা হোক যা করার করে ফেলছে। এই মুহূর্তে শুধু চিকিৎসক নয়, সকল স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য মানসম্মত পিপিই দিতে হবে। পিপিই বলতে শুধু গাউনটা না। কমপ্লিট সেটই পিপিই। আর আমাদের ডাক্তারদেরও উদাসীন হলে হবে না। সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।’

পিপিই ব্যবহার প্রসঙ্গে গুরুত্বারোপ করে বিএমএ নেতা বলেন, ‘আরেকটা বিষয় খুব অ্যালার্মিং। বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী বা নার্স যারা এটার (পিপিই) সঠিক ব্যবহার জানে না। তারা যে পিপিই পড়ে ডিউটি করে, সেই পিপিই পরে বাসায় চলে যায়। যদি সে কোন কারণে করোনা ভাইরাস বহন করে তাহলে সে যে দিকে যাচ্ছে সেদিকে ছড়িয়ে যাবে। সকলকে আরও সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।’

এই প্রসঙ্গ নিয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা চাইবো যত কম সংখ্যক ডাক্তার ইনফেক্টেড হয়। কারণ এরাই হচ্ছে ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা। এটা আসলে বিপদের কথা এবং তাদের পরিবারের জন্য বিপদের কথা। একজন ডাক্তার ইফেক্ট হওয়া মানে তার সঙ্গে থাকা সকলেই ইফেক্টেড হওয়া। তাই সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের সতর্কতার সাথে থাকতে হবে। এক নম্বর এটা বেশি যাতে না হয় সে চেষ্টা করতে হবে। তাদেরকে খুব সুরক্ষা নিয়ে চলতে হবে। দুই নম্বর হচ্ছে আমরা এসব ডাক্তারকে একসাথে কাজে লাগাচ্ছি না। তাদের রোস্টারভিত্তিক ডিউটি চলছে। তিন নম্বর হচ্ছে সকল ডাক্তারের লিস্ট আমাদের কাছে আছে যদি বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হয় তাহলে তাদেরও আমরা ব্যবহার করব।’

একই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে চিকিৎসাসেবা যারা দেবে, সে ক্ষেত্রে তো আমরা সংকটে পড়ে যাব। যদি কোনো ডাক্তার পজেটিভ হয় তাহলে তার সংস্পর্শে আসা সকলকে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইন কিংবা আইসোলেশনে চলে যেতে হবে। আমাদের যে সুরক্ষা সামগ্রী আছে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। শুধু পরলেই হয় না। এগুলো খোলার যথাযথ নিয়ম ব্যবহার করতে হবে। পরা যত না সহজ, খোলা কিন্তু কঠিন। যদি ঠিকমত না খোলা হয় তাহলে ইনফেক্টেড হয়ে যেতে পারে। প্রথমত আমাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং এগুলোর ব্যবহারবিধিও জানতে হবে।’

চট্টগ্রামে সংক্রমিত সাত ডাক্তারের প্রসঙ্গে সিভিল সার্জন বলেন, ‘আমার জানামতে চট্টগ্রামের একজন ডাক্তার সংক্রমিত হয়েছে। তাদের সাথে কথা বলতে হবে। তাহলে জানা যাবে। এভাবে হলে আমাদের ডাক্তার সংকট হয়ে যাবে এবং চিকিৎসাসেবায় প্রভাব পড়বে।’

এ নিয়ে জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ডা.সুশান্ত বড়ুয়া চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যখাতের এত অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েও ডাক্তারেরা যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবার তা সকলের কাছে ক্লিয়ার হয়েছে। আর এই অব্যবস্থাপনায় ভিকটিমরা যে ডাক্তারেরাই তা বেরিয়ে আসলো। চিকিৎসা এক জিনিস আর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরেক জিনিস। এতদিন আমরা চিকিৎসকদের দোষারোপ করে এসেছি। কিন্তু কখনো তার ব্যবস্থাপনাকে খতিয়ে দেখার চেষ্টা করিনি। এখন সকলের কাছে তা ক্লিয়ার হয়ে গেল। আর তাতে যে ক্ষতি হওয়ার তা হয়েই গেছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাকে যদি ইমিডিয়েটলি রিকভার করা না হয় তাহলে কিছু করার থাকবে না। এখন এই ক্ষতি আমরা কী করে পোষাবো, আমি ডাক্তার হয়েও বুঝতে পারছি না। আর আমাদের ব্যবস্থাপক যারা কর্তৃপক্ষ আছেন তারাও এটার কোনো সদুত্তর দিতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এতো সংখ্যক ডাক্তার সংক্রমিত হওয়া মানে এটা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়বে। ডাক্তারদের নিরাপত্তা আগে। মানে জনগণের স্বাস্থ্য অর্থাৎ জনস্বাস্থ্যের পূর্ব শর্ত বা প্রথম ধাপ। ডাক্তাররা আগে সুরক্ষিত থাকা বা স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ রাখা মানে রোগীদের নিরাপদ রাখা। ডাক্তাররা কেবল নিজেদের নিরাপত্তা দাবি করছে ব্যাপারটা এরকম না। রোগীদের নিরাপত্তার জন্যই কিন্তু তারা নিজেদের নিরাপত্তা চাইছে।’

প্রসঙ্গত, দেশে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৭২ জন। করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১২০ জনের। এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৯২ জন।

সিপি

ksrm