অনুসন্ধান/ দূরে সরে অপেক্ষায় ছিল হাতির পাল, তবু এগিয়ে আসেনি কেউ

লোহাগাড়ায় এশীয় হাতির করুণ মৃত্যু

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি এলাকার একটি ধানক্ষেতের প্রায় দেড় ফিট নরম কাদামাটিতে পড়ে ছিল প্রায় ছয় টন ওজনের ৭০ বছরের বেশি বয়সী বন্যহাতিটি। হাতিটির পিছনের বাম পায়ে আগেই বাসা বাঁধে গ্যাংগ্রিন রোগ। পায়ের থাবায় (তালুতে) তিন ইঞ্চি ক্ষতের জায়গাজুড়ে ধরে পচন। ক্ষত পায়ে হাঁটতে না পারায় একরকম নিরুপায় হয়েই কাদামাটিতে থেকে আর্তচিৎকার জুড়ে দেয়।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি এশীয় হাতির জন্য পরিচিত। এটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে এশীয় হাতিদের চলাচলের জন্য একটি প্রধান রাস্তা।

চট্টগ্রাম প্রতিদিনের অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাতির চিৎকারে শুক্রবার (৮ নভেম্বর) দুপুরে লোকালয়ে পড়ে যায় কোলাহল। খবর দেওয়া হয় বাংলাদেশ বন বিভাগের (ডিওএফ) বন্যজীবন বিভাগকে। ততক্ষণে সন্ধ্যা। একদিকে বৈরী আবহাওয়া, অন্যদিকে জঙ্গল। হাতির কাছে ছিল তার স্বজাতির কয়েকটি হাতি। তাই কাছে যেতে সাহস পায়নি কেউই। এভাবে অসহায় হাতিটি কাদায় পড়ে ছিল প্রায় ১৬ ঘন্টা।

এদিকে খবর পেয়েই বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তারা গঠন করেন মেডিকেল টিম। পরদিন শনিবার (৯ নভেম্বর) সকালে হাতির কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয় বন্যপ্রাণী বিভাগের কর্মকর্তারা। প্রায় ৮ ঘন্টার চেষ্টায় হাতিটিকে কাদামাটি থেকে শুকনো জায়গায় তুলে আনা হয়। দিনভর দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। টানা ২৪ ঘন্টা কাদায় আর গ্যাংগ্রিনের যন্ত্রণা সয়ে পঁচনশীল রোগে আক্রান্ত হয়ে রোববার ১০ নভেম্বর ভোরে অবশেষে মারা যায় এ বন্য হাতি।

যে কারণে মারা গেল হাতিটি
হাতির পিছনের বামপায়ে গ্যাংগ্রিন নামক রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় তিন ইঞ্চি পুরো জায়গাজুড়ে ক্ষত হয়ে পচন ধরে যায়। লিভারে সমস্যা, হার্টের চতুর্দিকে পানি জমে যাওয়া, পেটে গ্যাস জমে যাওয়া এবং বয়স্ক অবস্থায় বাচ্চা প্রসবের কারণে দুর্বল হয়ে যাওয়াসহ গ্যাংগ্রিনের কারণে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে (ইন্টারনাল হ্যামারেজ) মারা যায়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ
এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বনকর্তাদের অবহেলায় প্রাণ গেল কাদায় আটকেপড়া হাতিটির। সঠিক সময়ে উদ্ধার কাজে এগিয়ে না আসা এবং আটকা থাকার খবর পেয়েও এগিয়ে আসেনি বন্যপ্রাণী বিভাগের বিট কর্মকর্তারা। যার কারণে দীর্ঘ সময় কাদায় আটকে মারা যায় হাতিটি— এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর

এদিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চুনতি রেঞ্জের কর্মকর্তারা জানান, গভীর গর্ত ছাড়া বন্যহাতিরা নিজে নিজেই যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম। কাদামাটি থেকে উদ্ধার হাতিটিকে শুকনো রাখতে একটি তাঁবু স্থাপন করা হয় এবং সেটাকে বাঁচানোর জন্য কঠোর চেষ্টা করেন তারা । তবে প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী বন্যপ্রাণীরা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে তাদের সার্বিক অবস্থা বুঝতে পারে। আর বন্যহাতি দীর্ঘ ১৫ দিন না খেয়ে বেঁচে থাকতে পারলেও পানি পান করা ছাড়া বাঁচতে পারে না। প্রায় প্রতিদিন একটি হাতির জন্য ২০০ লিটার পানির প্রয়োজন। তাই বন্যহাতি মৃত্যুর আগে পানির কাছাকাছি থাকতে চায়।

এদিকে অসুস্থ হাতি হাঁটতে না পেরে কাদামাটিতেই আশ্রয় নিয়েছিল। একইসাথে হাতির স্তন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সম্প্রতি বাচ্চা প্রসব করায় হাতির শরীর খুবই দূর্বল। আর দীর্ঘ সময় খাবার না খাওয়ার কারণে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই শুকনো জায়গায় তুলে চিকিৎসাসেবা দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরও হাতিটিকে বাঁচানো যায়নি।

অভিযোগ নিয়ে উল্টো প্রশ্ন বন কর্মকর্তাদের
বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের কর্মকর্তা মো. মনজুরুল আলম প্রশ্ন রাখেন, কেউ যদি কোনো বিষয়ে অভিজ্ঞ বা পারদর্শী না হয়ে সেই বিষয়ে বললে কতটা ইফেক্টিভ (কার্যকর) হবে? সেটা কতটা যুক্তিসংগত তা জ্ঞানী মানুষেরাই বুঝবে। এলাকাবাসী দুপুরে জেনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানায় সন্ধ্যায়। তৎক্ষণাৎ মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়। একে আবহাওয়ার বৈরী আচরণ এবং অন্যদিকে জঙ্গল। সেখানে অন্য হাতির পালও রয়েছে। তাই রাতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাছাড়া হাতিটি গ্যাংগ্রিনের কারণে ইন্টারনাল হ্যামারেজে (অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে) দুর্বল হয়ে পড়ে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাসের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজ চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘শনিবার সকাল সাতটায় কক্সবাজারের দুলাহাজারায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের পশু চিকিৎসকদের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল। হঠাৎ প্রায় ৮ থেকে ১০টি হাতির একটি ঝাঁক উপস্থিত হলে সেখানে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি। হাতির পাল চলে যাওয়ার পর হাতিটিকে উদ্ধার করার কাজে নামা হয়। বন্য হাতিটির বাম পায়ের নিচে গ্যাংগ্রিন থাকায় আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। কর্দমাক্ত মাটিতে আটকা পড়ার আগে অসুস্থ হয়ে এখানে এসে পড়ে। হয়তো জঙ্গল দিয়ে আসার সময় এটি আহত হয়ে থাকতে পারে।’

‘আমরা সেখানে হাতিটিকে যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা দিয়ে সেখানে হাতি বিশেষজ্ঞদের একটি দলও মোতায়েন করা হয়েছিল যাতে হাতি সুস্থ হয়ে যায়। দিনভর চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পর রাতে তাঁবু ও খড়কুটো দিয়ে শুকনো জায়গায় রেখে আসি। গ্যাংগ্রিনের কারণেই কিন্তু আজ (রোববার) ভোরে হাতিটি মারা যায়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ প্রসঙ্গে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চুনতি রেঞ্জের কর্মকর্তা মো. মনজুরুল আলম চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা যারা কাজ করবো, আমাদের তো জানতে হবে। সন্ধ্যায় খবর পেয়ে পরদিন সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে সারাদিন চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। হ্যাঁ মেনে নিচ্ছি ঘটনার দিন রাতের কারণে আমাদের প্রায় ১২ ঘন্টা দেরি হয়েছে। কিন্তু তাছাড়া তো আমাদের কিছুই করার ছিল না। বৈরী আবহাওয়া এবং রাতের কারণে ঘটনার দিন সাথে সাথে যেতে পারিনি। এতে যদি আমাদের ভুল থাকে তাহলে মাথা পেতে নেবো।

বনবিভাগ ডিএফও (দক্ষিণ) পদুয়া রেঞ্জের কর্মকর্তা মো. সরওয়ার জাহান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘ হাতিটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেখানেই ছিল। আমরা পুরো একদিন চেষ্টা করেছি সুস্থ করতে। কিন্তু বয়স হওয়ায় নানান রোগে আক্রান্ত হওয়াতে হাতিটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সেটা তো জঙ্গল। অন্য হাতির পালও রয়েছে। তাছাড়া আমরা খবর পেয়েছি প্রায় সন্ধ্যায়। রাত হয়ে যাওয়ায় ডাক্তার আসেনি। পরদিন সকালেই মেডিকেল টিম গিয়ে সারাদিন চিকিৎসা দেয়া হয় হাতিকে। সন্ধ্যায় তাঁবু, খড়কুটো দিয়ে চলে এসেছি।

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের পশুসার্জন ডা. মোস্তা‌ফিজুর রহমান চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘হাতিটির পিছনের বামপায়ের ইনফেকশন হয়ে প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ায় হাঁটতে পারেনি। এছাড়া হার্টের চতুর্দিকে পানি জমে গেছে, লিভার ড্যামেজ, বয়স্ক মহিলা হাতি এবং সম্প্রতি বাচ্চাও প্রসব করেছে। মূল কথা কম্পলিকেটেড কেস— যার জন্য বাঁচানো যায়নি।’

এসআর/সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!