ইউনিলিভারের আইকিউ নেক্সাসে বদলাচ্ছে খুচরা বাজার

‘সঠিক পণ্য, সঠিক দোকান’

বিচ্ছিন্ন খুচরা বাজার, অঞ্চলভেদে ভিন্ন চাহিদা আর অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত—এই পুরোনো বাস্তবতাকে বদলে দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘আইকিউ নেক্সাস’ চালু করেছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড। লক্ষ্য একটাই, সঠিক পণ্য সঠিক সময়ে সঠিক দোকানে পৌঁছে দেওয়া, যাতে বিক্রি ও মজুতের মধ্যে তৈরি হয় কার্যকর ভারসাম্য। দেশব্যাপী চালুর আগে প্ল্যাটফর্মটি পাইলট হিসেবে প্রয়োগ করা হয় চট্টগ্রামের হালিশহর, ঢাকার মিরপুর, সৈয়দপুর, চাঁদপুর ও খুলনা এলাকায়। তাতে মিলেছে ইতিবাচক ফল।

বিচ্ছিন্ন বাজারে পরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে প্রায় ১৪ লাখ ছোট ফাস্ট মুভিং কনসিউমার গুডস (এফএমসিজি) দোকানের ওপর। প্রতিদিন কোটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পৌঁছে যায়। তবে এই বাজার অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অঞ্চলভেদে পণ্যের প্রাপ্যতা ও বৈচিত্র্যে বড় পার্থক্য দেখা যায়। অনেক গ্রামীণ এলাকায় এখনও পণ্যের সঠিক বৈচিত্র্য নিশ্চিত করা কঠিন। কোথাও সাবানের চাহিদা বেশি, কোথাও শ্যাম্পু বা টুথপেস্টের বিক্রি বেশি—এই বৈচিত্র্যের মধ্যে পরিকল্পনা করা দীর্ঘদিন ধরে ছিল অভিজ্ঞতা ও অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।

এআই বিশ্লেষণে বদলে যাচ্ছে সিদ্ধান্তের ধরন

দ্রুত বদলে যাওয়া বাজার বাস্তবতায় সেই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হওয়ায় ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড নিয়ে এসেছে ‘আইকিউ নেক্সাস’। নিউরাল নেটওয়ার্কভিত্তিক এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিদিনের বিক্রয় তথ্য, আউটলেট পরিদর্শনের তথ্য এবং বাজারের আচরণ বিশ্লেষণ করে। একই ধরনের আউটলেটগুলোর বিক্রয় আচরণের তুলনামূলক বিশ্লেষণও এতে যুক্ত থাকে। ফলে প্ল্যাটফর্মটি নিজে নিজেই শেখে এবং সময়ের সঙ্গে কোন এলাকায় কোন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে বা কমছে তা নির্ণয় করতে পারে। এতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তাৎক্ষণিক তথ্যের ভিত্তিতে, অনুমানের ওপর নয়।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় মিলছে একই ইঙ্গিত

এই ধারণা নতুন নয়। স্পেনের সুপারমার্কেট নিয়ে দুই বছরব্যাপী অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পণ্যের সংখ্যা বেশি হলেই বিক্রি বাড়ে না; বরং সঠিক পণ্যের বৈজ্ঞানিক সমন্বয়ই চাহিদা বৃদ্ধিতে বেশি কার্যকর। যুক্তরাজ্যের খুচরা বিক্রেতা টেসকোর পণ্য তালিকা পুনর্বিন্যাসের অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতা তুলে ধরে। তবে বৈশ্বিক এফএমসিজি শিল্পে এ ধরনের উন্নত বিশ্লেষণ সক্ষমতা এখনও সীমিত, সেই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই কাজ করছে আইকিউ নেক্সাস।

পাইলটে মিলল ইতিবাচক ফল

দেশব্যাপী চালুর আগে প্ল্যাটফর্মটি পাইলট হিসেবে প্রয়োগ করা হয় সৈয়দপুর, মিরপুর, চাঁদপুর, খুলনা ও হালিশহর এলাকায়। পরীক্ষামূলক ফলাফল অনুযায়ী, নন-নেক্সাস এলাকার তুলনায় এসব অঞ্চলে মোট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার বেড়ে ৭১ শতাংশে দাঁড়ায়, যেখানে অন্য এলাকায় ছিল ৬৫ শতাংশ। পণ্যের বৈচিত্র্যে ৬ শতাংশ এবং সরবরাহের গভীরতায় ৪ শতাংশ উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। ফলে সঠিক পণ্য সঠিক স্থানে পৌঁছানোর দক্ষতা স্পষ্টভাবে বৃদ্ধি পায়।

রিটেইলারদের জন্য লাভের সমীকরণ

রিটেইলারদের জন্য এই পরিবর্তন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি ছোট দোকানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মজুত মানে মূলধন আটকে যাওয়া, আর ঘাটতি মানে বিক্রি হারানো। আইকিউ নেক্সাস দোকানভিত্তিক বিক্রয় প্রবণতা বিশ্লেষণ করে অর্ডার পরিকল্পনায় সহায়তা করছে, যা নগদ প্রবাহকে স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখছে। অনেক খুচরা বিক্রেতা দেখছেন, অপ্রয়োজনীয় স্টক কমছে এবং বিক্রয় পূর্বাভাস সম্পর্কে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে গাজী স্টোর নামের একটি আউটলেটে পণ্যের বৈচিত্র্য প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর ফলে মোট বিক্রি প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মাঠপর্যায়ে বিক্রয়ে নতুন ধারা

মাঠপর্যায়ের বিক্রয় কার্যক্রমেও এসেছে পরিবর্তন। বিক্রয় দলকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা এই সুপারিশগুলোর যুক্তি রিটেইলারদের কাছে সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। আগে যেখানে ফিল্ড ভিজিট মূলত অর্ডার সংগ্রহকেন্দ্রিক ছিল, এখন তা পরিণত হয়েছে পরামর্শভিত্তিক আলোচনায়। তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের কারণে তারা এখন জানেন কোন দোকানে কোন পণ্য অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

ডিজিটাল অর্ডারিংয়ে যুক্ত নতুন সুবিধা

নতুন পণ্য দ্রুত সঠিক স্থানে পৌঁছানোর পাশাপাশি প্রচারণাও হচ্ছে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী। আইকিউ নেক্সাসের সুপারিশগুলো ইউনিলিভারের ডিজিটাল অর্ডারিং অ্যাপ ‘ইউকার্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, ফলে রিটেইলাররা অর্ডার দেওয়ার সময়ই দেখতে পাচ্ছেন কোন পণ্য তাদের দোকানের জন্য উপযোগী।

ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত ব্যবহার

ভবিষ্যতে এই প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মৌসুমি প্রবণতা, স্থানীয় উৎসব এবং আবহাওয়াভিত্তিক চাহিদা বিশ্লেষণেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে সম্পর্কনির্ভর বাংলাদেশের খুচরা বাজারে যখন তথ্যভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হচ্ছে, তখন বাজারব্যবস্থা আরও পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

কৌশলগত সক্ষমতা হিসেবে আইকিউ নেক্সাস

ইউনিলিভার বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়, বরং খুচরা বাজার ব্যবস্থাপনায় একটি কৌশলগত সক্ষমতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। লক্ষ্য হলো এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল খুচরা ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যেখানে ছোট গ্রামীণ দোকান থেকে বড় শহুরে আউটলেট—সবাই তথ্যভিত্তিক অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। এতে পণ্যের প্রাপ্যতা বাড়ার পাশাপাশি খুচরা ব্যবসার স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হবে।

অর্থনীতিতে অবদান ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি

ইউনিলিভার বাংলাদেশ শুরু থেকেই দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রেখে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯৬ শতাংশ পণ্য দেশেই উৎপাদিত হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ লাখ খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাসহ লাখো মানুষের জীবিকা নিশ্চিত হচ্ছে। নিয়মিত কর প্রদান ও লভ্যাংশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় অর্থনীতিতে দৃশ্যমান অবদান রাখছে। আইকিউ নেক্সাসের মতো উদ্যোগ সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন, যেখানে প্রযুক্তি ও অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে উন্নত সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের শীর্ষস্থানীয় এফএমসিজি উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান, যার যাত্রা ছয় দশকেরও বেশি সময়ের। দেশের প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে ৯টি পরিবার প্রতিদিনের প্রয়োজনে ইউনিলিভারের অন্তত একটি ব্র্যান্ড ব্যবহার করে। লাক্স, লাইফবয়, সার্ফ এক্সেল, ক্লোজআপ, সানসিল্ক, পন্ডস, ভ্যাসলিন ও ডাভসহ ২০টিরও বেশি ব্র্যান্ডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে আছে। ইউনিলিভার গ্লোবালের একটি সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশে ভোক্তাপণ্য সরবরাহকারী নেটওয়ার্কের অংশ।

ksrm