বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সশস্ত্র সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও মর্টারশেল বিস্ফোরণের প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের টেকনাফে। সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছে এক শিশু। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ অবস্থায় অনুপ্রবেশের দায়ে ৫৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৫২ জনই মিয়ানমারের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য।

রোববার (১১ জানুয়ারি) ভোরে গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশুটি আহত হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
আহত শিশুর নাম আফনান (১২)। সে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকার জসিম উদ্দীনের মেয়ে এবং লম্বাবিল হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী।
এদিকে সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই মিয়ানমারের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ৫২ সদস্য ও একজন বাংলাদেশিকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। রোববার দুপুরে হোয়াইক্যং সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে তারা অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করলে স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে বিজিবি তাদের আটক করে। পরে তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র সংঘর্ষ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাণভয়ের কারণে তারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত তিন থেকে চারদিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের উত্তরাংশে ব্যাপক গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে বলিবাজার, সায়েরবিল এবং নাফ নদীর তোতার দ্বীপকেন্দ্রিক এলাকায় সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। এসব বিস্ফোরণের শব্দে বাংলাদেশের হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকার জনবসতি কেঁপে ওঠে।
রোববার ভোরে এই সংঘর্ষের মধ্যেই মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া একটি গুলি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে পড়ে আফনানের শরীরে। এতে নতুন করে সীমান্তে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাতভর গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। একপর্যায়ে মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া গুলিতে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে সীমান্ত এলাকা থেকে মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ৫২ জনকে আটক করা হয়েছে।
স্থানীয়রা বাসিন্দারা জানান, নাফ নদীর তোতার দ্বীপ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই দ্বীপকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের রুট সক্রিয় রয়েছে। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ দিন দিন বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উত্তর পাড়া, কোনাপাড়া, তুলাতলী, খারাইংগা ঘোনা ও বালুখালী গ্রামে বসবাসকারী নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ অন্তত ১০ হাজার মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। একইসঙ্গে নদীনির্ভর হাজারো জেলের জীবন-জীবিকাও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
হোয়াইক্যং সীমান্ত আঞ্চলিক গ্রাম কমিটির সভাপতি আলমগীর চৌধুরী বলেন, হঠাৎ গুলির শব্দ শুরু হলে আমরা মাদ্রাসা ও স্কুলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই। শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। আমরা সীমান্তে স্থায়ী নিরাপত্তা চাই।
এ বিষয়ে কক্সবাজার বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যেতে সতর্ক করা হয়েছে। পরিস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।
টানা ১১ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর গত বছরের ৮ ডিসেম্বর মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা দখলে নেয় আরাকান আর্মি। এরপর প্রায় এক বছর সীমান্তে বড় ধরনের সংঘর্ষ না হলেও সাম্প্রতিক ঘটনায় সেই নীরবতা ভেঙে গেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে এক জেলে গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া গত ১৩ ও ২৫ ডিসেম্বর সংঘর্ষ চলাকালে মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া গুলিতে হোয়াইক্যং এলাকার কয়েকটি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
ডিজে




