অনিয়মে বিপন্ন চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমী, গা বাঁচাতে হঠাৎ ভোটের তোড়জোড়

৬ বছরে হয়নি একটি সভা, কেউ জানে না আয়-ব্যয়ের হিসাবও

চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির নানা অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে সাধারণ সদস্যরা। কার্যকরী কমিটির নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়মের তোয়াক্কা না করে বার্ষিক চাঁদা আদায়, ছয় বছরে সাধারণ সভা না করা, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ও তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। যদিও কমিটির নেতাদের দাবি, নিয়ম মেনেই হয়েছে সবকিছু।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৮ সালে কমিটি গঠন করা হয়। এতে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সাইফুল আলম বাবু। এছাড়া আরও ১০ জন বিভিন্ন পদে নির্বাচিত হন। তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হলেও ওই কমিটি ৬ বছর পর্যন্ত ছিল। এর মধ্যে একটি বার্ষিক সাধারণ সভাও হয়নি। সদস্যদের না জানিয়ে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে বার্ষিক চাঁদা ২০০টাকা থেকে ৫০০ টাকা বাড়ানো হয়। ৬ বছর পর হঠাৎ সদস্যদের কাছ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা বার্ষিক চাঁদা আদায় করে সদস্য নবায়ন করার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয় শিল্পকলা একাডেমি।

সদস্যরা বলছেন, শিল্পকলা একাডেমির গঠনতন্ত্রের ২এর-ঙ ধারা অনুযায়ী, জুলাই থেকে জুনের জন্য বার্ষিক চাঁদা অবশ্যই ৩০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

গঠনতন্ত্রের ৪এর-ক ধারা অনুযায়ী, দুই বছর চাঁদা অনাদায়ে সংশ্লিষ্ট সদস্যের সদস্যপদ বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে। অভিযোগ উঠেছে, গঠনতন্ত্রের ২এর-ঙ এবং ৪এর-ক ধারা লঙ্ঘন করে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তড়িঘড়ি করে ছয় বছরের সদস্য চাঁদা একসাথে পরিশোধের তারিখ নির্ধারণ করা হয়— যা সদস্যদের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। ঈদ-ঊল-ফিতরের ব্যস্ততা এবং সরকারি বন্ধের সময় ৪ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিলের মধ্যে সদস্যদের চাঁদা পরিশোধ করতে বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় চাঁদা পরিশোধ করতে না পারায় ভোটাধিকার হারিয়েছেন শতাধিক সদস্য। এভাবে নানা অনিয়মের মাধ্যমে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নির্বাচনের প্রস্তুতি চট্টগ্রামের সংস্কৃতি অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এদিকে নতুন সংস্কৃতিকর্মীদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পর চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচনের পুনঃতফসিল ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ মে) বিকেলে জেলা প্রশাসক বরাবর এক স্মারকলিপিতে শিল্পকলা একাডেমির ৫০ জনের বেশি সদস্য এই দাবি জানান।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্পকলা একাডেমীর নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে গতবার নির্বাচন করা আবৃত্তি শিল্পী রাশেদ হাসান বলেন, ‘কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সাধারণ সদস্যের না জানিয়ে হঠাৎ করেই নির্বাচন আয়োজনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। গঠনতন্ত্র অনুসারে তিন বছর পূর্ণ হবার পরই নির্বাচন আয়োজনের কথা। তাহলে তিন বছর মেয়াদের কমিটি প্রায় ছয় বছর কিভাবে পার করলো? এরপর এডহক কমিটি কখন গঠন হলো, কখন নির্বাচন উপ-কমিটি হলো—এসব বিষয়ে সাধারণ সদস্যরা কিছুই জানেন না। মহামারি করোনাকালীন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুদানের কোনো হিসাবও সদস্যদের দেওয়া হয়নি। ছয় বছরের বাজেট, বার্ষিক কার্যবিবরণী, সব রকমের খরচের হিসাব সদস্যদের কাছ থেকে একপ্রকার গোপনই করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে এসে সদস্যদের কাছ থেকে ছয় বছরের চাঁদা একসাথে আদায় করা হয়। দীর্ঘ এ সময়ে কোন বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘অনেক সাধারণ সদস্য মনে করেন দীর্ঘ ছয় বছরের অনিয়মের সুরাহা করে যে সকল সদস্য তাদের সদস্যপদ নবায়ন করতে পারেনি তাদেরকে সদস্যপদ নবায়নের নতুন সময় দেওয়া হোক। একই সাথে একাডেমীর নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হোক।’

চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির সদস্য ইমরান ফারুকী বলেন, ‘দুই বছর বার্ষিক চাঁদা না দিলে নিয়ম অনুযায়ী সদস্যপদ বাতিল হবে। এখন ৬ বছর বার্ষিক চাঁদা আদায় করা হয়নি। সেই নিয়ম অনুযায়ী এখন যারা নির্বাচন করবে তাদেরও তো সাধারণ সদস্যপদ থাকার কথা না। তাহলে তারা কীভাবে নির্বাচন করবে?’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা কালচারাল অফিসার মো. মোসলেম উদ্দিন দাবি করেছেন, ‘বার্ষিক চাঁদা বৃদ্ধি কেন্দ্র থেকে করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে চাঁদা বাড়ানোর সুযোগ নেই। এডহক কমিটি করা, তফসিল ঘোষণা করা সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে।’

তবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছর চাঁদা না দিলে সদস্যপদ বাতিল হওয়ার কথা— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে মাঝে চাঁদা আদায় করা যায়নি। এখন করোনার সময়ের চাঁদা মওকুফ করে অন্য বছরের চাঁদা আদায় হয়েছে। এরপরও নির্ধারিত সময়ে যারা সদস্যপদ নবায়ন করতে পারেননি তাদেরকে আবেদন করতে বলা হয়েছে।’

তবে জেলা কালচারাল অফিসারের এই বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিল্পকলা একাডেমীর একজন প্রবীণ সদস্য বলেন, ‘একতরফাভাবে বার্ষিক চাঁদা বাড়ানো হয়েছে ২০২১ সালে। কিন্তু সদস্যদের এই খবর জানানো হয়েছে চলতি বছর ২০২৪ সালে এসে। এটা কি গুরুতর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নয়?’

ওই সদস্য বলেন, ‘গত ৬ বছরে একটি বার্ষিক সাধারণ সভা যেখানে করা হয়নি, বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাবটুকু পর্যন্ত যেখানে দেওয়া হয়নি—সেখানে কোন্ নিয়মই বা পালন করা হল?’

তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘তিন বছরের একটি কমিটি কিভাবে ৬ বছর পার করলো— এই স্বেচ্ছাচারিতার জবাব কে দেবে?’

এদিকে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বাগমনিরাম ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বাবুকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তার পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি।

সিপি

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!