অচল করার অপচেষ্টা রুখে দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর, এক আদেশে ১৫ ‘উস্কানিদাতা’র কপাল পুড়ল

এনসিটি নিয়ে ‘সাজানো’ আন্দোলন

চট্টগ্রাম বন্দরে হঠাৎ কর্মবিরতি দিয়ে কার্যক্রম প্রায় অচল করার ঘটনায় এবার ১৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঢাকাসহ অন্যান্য বন্দরে বদলি করা হয়েছে। এদের মধ্যে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের দুই সমন্বয়কসহ বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা রয়েছেন।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ডাকে গত শনিবার থেকে কর্মবিরতি পালিত হচ্ছে। সকাল আটটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত স্থায়ী কর্মচারী ও বেসরকারি শ্রমিকদের একাংশ এতে অংশ নিচ্ছেন। ফলে কার্গো বার্থ, সিসিটি ও এনসিটিতে স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে। গত ২৯ জানুয়ারি এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে করা রুল হাইকোর্ট খারিজ করে দেন।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চবক শাখার সহকারী সচিব মো. বেলায়েত হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে কর্মরত এই ১৫ জনকে বদলি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

অফিস আদেশ অনুযায়ী, চবক থেকে পানগাঁও আইসিটি (ঢাকা) সংযুক্ত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবিরকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক। একইভাবে পানগাঁও আইসিটি সংযুক্ত নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকনকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক।

এছাড়া পানগাঁও আইসিটি (ঢাকা) সংযুক্ত প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমান, পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মো. শফি উদ্দিন ও রাশেদুল ইসলামকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন বিভাগের এফসিএল শাখার উচ্চ বহিঃসহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে মোংলা বন্দর, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনোটাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলামকে পায়রা বন্দর এবং বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার মো. হুমায়ুন কবিরকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলি করা হয়েছে।

পানগাঁও আইসিটি সংযুক্ত চবক প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, চবক যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি এবং প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামশু মিয়াকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। চবক যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মো. লিয়াকত আলী ও একই পদের আমিনুর রসুল বুলবুলকে যথাক্রমে পায়রা ও মোংলা বন্দরে এবং যান্ত্রিক বিভাগের খালাসি মো. রাব্বানীকে পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের সদস্য, কেউ কেউ বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য।

বন্দরের অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, দাপ্তরিক প্রয়োজনে ও জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এ আদেশ জারি হয়েছে এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত ১ ফেব্রুয়ারি কর্মবিরতি পালনকারী আরও ১২ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পৃথক আদেশে বদলি করা হয়েছিল।

চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনাল অফিসার মো. নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, দুটি পৃথক দাপ্তরিক আদেশে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে, যা জরুরি দাপ্তরিক ও অপারেশনাল কাজের প্রয়োজনে কার্যকর করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের চট্টগ্রাম থেকে অন্যত্র বদলি করছে। এতে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।’

বুকিংয়ে ফিরছেন ৭ হাজার কর্মী

চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রম শাখায় নিবন্ধিত প্রায় সাত হাজার শ্রমিক-কর্মচারীকে নিয়মিতভাবে বুকিং দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলোর জিম্মিদশার মুখে বন্দর সচল রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা’ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডাকা কর্মবিরতিতে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ও রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) বন্দরের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ার পর কর্তৃপক্ষ আরও কঠোর অবস্থান নেয়।

শ্রম শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, বার্থ অপারেটর, টার্মিনাল অপারেটর ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের অধীনে থাকা নিবন্ধিত শ্রমিকদের সরাসরি বুকিং দেওয়া গেলে শ্রমিক সংগঠনের চাপ এড়িয়ে বন্দরের স্বাভাবিক কাজ চালু রাখা সম্ভব হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শ্রম শাখা থেকে ৩১ জানুয়ারি তারিখে জারি করা এক চিঠিতে বার্থ, টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের কাছে অনুরোধ জানানো হয়, বন্দরের সচলতা বজায় রাখতে শ্রম শাখায় নিবন্ধিত শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়মিতভাবে বুকিং দিতে হবে। চিঠিতে বলা হয়, অপারেশন সচল রাখাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

চিফ ওয়েলফেয়ার অফিসারের স্বাক্ষরিত ওই নথির অনুলিপি বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য, পরিচালক (প্রশাসন), পরিচালক (ট্রাফিক), সচিব, সিঃ ওয়েলফেয়ার অফিসার, ওয়েলফেয়ার অফিসার, বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং এন্ড বার্থ অপারেটরস্ এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান, বার্থ ও টার্মিনাল অপারেটর ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি, সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড এবং চেয়ারম্যানের পিএর কাছেও পাঠানো হয়েছে।

হঠাৎ করে শ্রম শাখায় নিবন্ধিত শ্রমিক/কর্মচারীদের বুকিং প্রদানের বিষয়ে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ ওয়েলফেয়ার অফিসার নাসির উদ্দিন চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘হঠাৎ করে নয়, মাঝেমধ্যেই এমন চিঠি আমরা দিয়ে থাকি। যেহেতু নানা কারণে ইদানিং বন্দরের কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে, এই প্রেক্ষাপটে সাপ্লাই চেইন-লোডিং আনলোডিং ঠিক রাখার জন্য এমন নির্দেশনা দিয়েছি আমরা।’

এক মাস সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ

বন্দর এলাকায় আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘ্ন রাখতে এক মাসের জন্য সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধন নিষিদ্ধ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজের স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ০১ মিনিট থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত বন্দরসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং ‘১(ক)’ শ্রেণির অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ এখান দিয়ে সম্পন্ন হয় এবং প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। সভা-সমাবেশের কারণে যানজট সৃষ্টি হলে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হয়, যা জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ২৯ ও ৩০ ধারার ক্ষমতাবলে বারেক বিল্ডিং মোড়, নিমতলা মোড়, ৩ নম্বর জেটি গেট, কাস্টমস মোড়, সল্টগোলা ক্রসিংসহ বন্দরসংলগ্ন এলাকায় অস্ত্র, লাঠি, বিস্ফোরক বহন এবং সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এ অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।

এদিকে বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত আরেক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অফিস চলাকালে মিছিল, মহড়া বা আন্দোলনে অংশ নিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিপি

ksrm